ঢাকা,  সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

রোগীর সেবা-শুশ্রুষা ও দেখতে যাওয়ার আদব (পর্ব- ২)

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ২০:০৫, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
রোগীর সেবা-শুশ্রুষা ও দেখতে যাওয়ার আদব (পর্ব- ২)
প্রতীকী ছবি

আগের আলোচনায় রোগীকে সেবা শুশ্রুষার ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এ পর্বে আরো কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো। 

ইচ্ছে হলেই রোগীকে দেখতে গেলাম, সেখানে বসে থাকলাম, এটার নাম রোগীর সেবা-শুশ্রুষা নয়। রোগী দেখার উদ্দেশ্যও এটা নয়। ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে মাহবুবকে কষ্ট দেয়ার নাম ‘সেবা’ নয়। 

ভালোবাসার জন্যও বুদ্ধি-শুদ্ধি থাকতে হয়। বুদ্ধি-বিবেক খরচ না করতে পারলে সে মহব্বত প্রকৃত মহব্বত নয়, বরং এটা নির্বুদ্ধিতা ও শত্রুতা। যেমন ঘুমানোর সময় কিংবা আরামের সময় গিয়ে আপনি উপস্থিত হলেন, এটাও ঠিক নয়।

Advertisement

অকৃত্রিম বন্ধু বিলম্ব করতে পারে:
এক অকৃত্রিম বন্ধু অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে গেলো, বন্ধু বন্ধুকে পেয়ে খুশি। বন্ধু এত বেশি সময় কাছে থাকুক এটাই বন্ধুর কামনা, ব্যাপারটা যদি এমন হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্য বিলম্ব করার অনুমতি আছে। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা রয়েছে। মুফতি শফী (রহ.) এর একজন প্রিয় উস্তাদ ছিলেন, যাকে তিনি খুবই মুহাব্বত করতেন। মিয়া আসগর হোসাইন (রহ.)। এ উস্তাদ হজরতকেও গভীর স্নেহ করতেন।

একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শফী (রহ.) খবর শুনে তাকে দেখতে গেলেন। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখার আদবের প্রতি লক্ষ্য রেখে শফী (রহ.) প্রথমে তাকে সালাম দিলেন, ভালো-মন্দ খোঁজ-খবর নিলেন, নির্দিষ্ট দোয়া পড়লেন, তারপর চলে আসার অনুমতি চাইলেন। তখনি মিয়া আসগর হোসাইন (রহ.) একটু পেরেশান হয়ে বলে উঠলেন, তোমরা হাদীস শরীফে পড়েছো من عاد منكم فليخفف (রোগীকে সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতরে দেখে আসবে) এটা একটা মূলনীতি, রোগী দেখার একটা আদব। কিন্তু এটা কী কেবল আমার জন্য পড়েছো? এ আদবটি কী আমার বেলায়ও প্রয়োগ করতে চাচ্ছো?

শোনো, এ মূলনীতি তখন প্রযোজ্য; যখন রোগী কষ্ট পাবে। কিন্তু রোগী যদি সাক্ষাতকারীর বিলম্বের মাঝেই আরাম পায়, তখন এ আদবটি প্রযোজ্য নয়। সুতরাং তুমি? বসে পড়ো। আরেকটু দেরী কর।’

অতএব বুঝা গেলো, সবখানে, সব পরিবেশে এক ধরণের হুকুম প্রযোজ্য নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষ রোগীর কাছে বিলম্ব করাটাই হলো সুন্নত। কারণ উদ্দেশ্য হলো রোগী একটু প্রশান্তি লাভ করা। প্রশান্তি সে যেভাবে পাবে, সেভাবেই করতে হবে। তখনই রোগী দেখার সওয়াব অর্জিত হবে।

অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দুআ করা:
রোগী দেখার দ্বিতীয় আদব হলো, তার জন্য দোয়া করা। অর্থাৎ প্রথমে সংক্ষিপ্তাকারে তার খোঁজ-খবর নিবে, কেমন আছে জানতে চাইবে। তারপর রোগী যখন তার অবস্থার কথা বলবে, তখন তার জন্য দোয়া করবে। কী দোয়া করবে, সেটাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলে দিয়েছেন। তিনি রোগীর জন্য নিম্নোক্ত দোয়াটি করতেন:

لا بأس طهور انشاء الله 

অর্থাৎ রোগের কারণে যে কষ্ট তুমি পাচ্ছ, এটা আপনার জন্য অনিষ্টকর নয়। তোমার ‘কষ্ট’ ইনশাআল্লাহ আরামে পরিণত হবে। এটা তোমার জন্য গুনাহ মাফের কারণ হবে। (বুখারী, হাদীস নম্বর- ৩৩৪৭)।

এ দোয়াটির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে রোগী এক প্রকার সান্তনা পায়। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে রোগীর গুনাহ মাফ এবং সওয়াব লাভের কামনা করা হয়।

অসুস্থতার কারণে গুনাহ মাফ হয়:
হাদীসটি নিশ্চয় আপনারা শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মুসলমানের প্রতিটি কষ্টের পরিবর্তে আল্লাহ তাকে একেকটি গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এমনকি কোনো মুসলমানের পায়ে কাঁটা বিধলেও এর জন্য আল্লাহ তায়ালা তার গুনাহ মাফ করে দেন। এছাড়াও আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

الحمى من فيح جهنم

‘জ্বর জাহান্নামের উত্তাপের একটি অংশ।’ (বুখারী, হাদীস নং- ৩০২১, মুসলিম, হাদীস নং- ৪০৯৩)

এ হাদীসের একাধিক ব্যাখ্যা ওলামায়ে কেরাম করেছেন। তন্মধ্যে এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, জ্বরের উত্তাপ জাহান্নামের উত্তাপের বিনিময়ে হয়ে থাকে। তথা গুনাহসমূহের কারণে জাহান্নামের যে আগুন ভোগ করতে হতো, এ দুনিয়াতে জ্বরের মাধ্যমে তার বিনিময় দিয়ে দেয়া হয়, যেন জাহান্নামের উত্তাপ তাকে পোহাতে না হয় এবং জ্বরের কারণে যেন সে গুনাহগুলো মুছে যায়। এ ব্যাখ্যার সমর্থনে পূর্বোক্ত হাদীসটিকেও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীর জন্য এ দোয়া করতেন,
 
لا بأس طهورا انشاء الله 

অর্থাৎ চিন্তা করো না, এ জ্বরের কারণে তোমার গুনাহখাতা ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দেবেন।

সুস্থতার জন্য একটি আমল:
অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত করার তৃতীয় আদব হলো, যদি পরিবেশবান্ধব হয় এবং আমলটি করলে যদি অসুস্থ ব্যক্তি কষ্ট পাওয়ার ভয় না থাকে, তাহলে তার কপালের ওপরে হাত রেখে এই দুআটি পড়বে:

اللهم رب الناس مذهب البأس اشف انت الشافى لا شافى الا انت شفاء لا يغادر سقما 

‘হে আল্লাহ! যিনি সকল মানুষের প্রভু। যিনি কষ্ট দূরীভূত করেন, এ রোগকে ভালো করে দিন। আপনি সুস্থতা দানকারী। আপনি ছাড়া কোনো আরোগ্যকারী নেই এবং সকল অসুস্থতার সুস্থতা আপনি দান করুন।’ (বুখারী, হাদীস নং- ৫২৪৩, মুসলিম, হাদীস নং- ৪০৬১) 

দোয়াটি প্রত্যেকের মুখস্থ রাখা উচিত এবং দোয়াটি পড়ার অভাস গড়ে তোলা জরুরি। যেন সুযোগ হলেই দোয়াটি পড়া যায়।

সকল রোগের চিকিৎসা:
আরেকটি দোয়া আছে। সেটিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই বর্ণিত। সহজ ও সংক্ষিপ্ত দোয়া। মুখস্থ রাখা সহজ অথচ ফায়দা ও ফযীলত অনেক। দোয়াটি এই:

اسأل الله العظيم رب العرش العظيم ان يشفيك 

অর্থাৎ ‘আমি মহান আল্লাহ কাছে প্রর্থনা করছি, যিনি মহান আরশের মালিক, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।’ (আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৭০০, তিরমিযী, হাদীস ন- ২০০৯)।

আরো পড়ুন>>> সত্তর হাজার ফেরেশতার দোয়া লাভ হয় যে আমলে

হাদীসে আছে, যে মুসলমান অপর মুসলমান ভাই অসুস্থ হওয়ার পর তাকে দেখতে গেলে এ দোয়াটিট পড়বে, তাহলে সে ব্যাধিটি যদি মৃত্যুরোগ না হয়, আল্লাহ তাকে সুস্থতা দান করবেন। কিন্তু সে রোগ মৃত্যুর কারণ হলে সেটা ভিন্ন কথা।

রোগী দেখার সময় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করুন:
হাদীসে উল্লেখিত এসব দোয়া পড়লে তিনভাবে সওয়াব পাওয়া যাবে। প্রথমত. রোগী দেখার সময় সুন্নতের উপর আমল করার সওয়াব। কারণ এসব দোয়ার শব্দসমূহ তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এবং তিনি নিজেও রোগীর জন্য এ দোয়াগুলো পড়তেন। দ্বিতীয়ত. এক মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সহমর্মিতা ও দরদ প্রকাশের সওয়াব পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত. অসুস্থের জন্য দোয়া করার সওয়াব পাওয়া যাবে। সুতরাং রোগীকে দেখার নিয়ত করলে এ তিনটি আমলেরও নিয়ত করে নিবে। তাহলে ইনশাআল্লাহ সবগুলোর সওয়াব অর্জিত হবে।

দ্বীন কাকে বলে?
স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো একটি কথা বলতেন শায়খ হজরত ডা. আবদুল হাই (রহ.)। তিনি বলতেন, শুধু দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের নাম হলো দ্বীন। একটু দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কর, তাহলে তোমার পার্থিবতাও দ্বীন হয়ে যাবে। যে কাজগুলো তোমরা সব সময় করছ, সেগুলোও তখন ইবাদতে পরিণত হবে এবং এর কারণে আল্লাহও সন্তুষ্ট হবেন। তবে শর্ত হলো, দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত. নিয়তের মধ্যে ভেজাল থাকতে পারবে না বরং খালেছ নিয়ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত. কাজটি সুন্নত তরীকায় করতে হবে। ব্যস, প্রতিটি কাজে শুধু এ দুটি কাজ কর, তাহলে ওই কাজটিই দ্বীনের কাজ হয়ে যাবে।

আসলে বুযুর্গদের কাছে যাওয়ার ফায়দা এটাই। তারা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেন। চিন্তার সূত্র ঘুরিয়ে দেন। ফলে মানুষ কাজ-কারবার সহীহ পথে চলে এবং দুনিয়ার কাজও দ্বীনের কাজে পরিণত হয়।

রোগী দেখার সময় হাদিয়া নিয়ে যাওয়া:
রোগী দেখার সময় হাদিয়া নেয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে ব্যাপক। অনেকে এটাকে জরুরি মনে করে। কারো কারো ধারণা হলো, হাদিয়া না নিলে রোগীর বাসার লোকজন খারাপ মনে করবে। এ জাতীয় আরো কত ভাবনা মানুষকে অস্থির করে তোলে। অবশেষে অনেকের জন্য হাদিয়া নেয়া সম্ভব হয় না এবং রোগীকে দেখারও তাওফীক হয় না। অথচ রোগী দেখার জন্য হাদিয়া নিতেই হবে এ ধরণের কোনো বিধান ইসলামে নেই। 

এটি রোগী দেখার জন্য ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নতও নয়। এটা নিছক সামাজিক প্রথা। এ রুসমের পাল্লায় পড়ে আমরা কত বড় সওয়াব থেকে মাহরূম হয়ে যাই। শয়তান মানুষকে এ রুসমের ধোকায় ফেলে। আল্লাহ ওয়াস্তে রুসমটি বর্জন করুন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!