হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-৩)
এক চিঠির উত্তরে হজরত থানবি (রহ.) লিখেন, কারো ক্ষতি ও অবনতির সংবাদ শুনে যদি মনে আনন্দ জাগে তা হলে তা হচ্ছে হাসাদ বা হিংসা।
তবে শুধু মনের এই অবস্থার উপর শাস্তি হবে না। যদি মনের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করা হয় তা হলে শাস্তি হবে। যেহেতু কাজটা ইচ্ছাধীন। তবে ওই প্রবণতা দুর্বল করা কর্তব্য, যেন তা প্রবল হয়ে না ওঠে। এর উপায় এই যে, মনে মনে লজ্জিত হবে এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করবে, আল্লাহ তায়ালা যেন তা দূর করে দেন। ওই ব্যক্তি সহযোগিতা করবে, তা কাজকর্মের দ্বারা হোক কিংবা দোয়ার মাধ্যমে হোক। এভাবে এই মন্দ প্রবণতা দূর হয়ে যাবে। (আনফাসে ইসা-১৭৪)।
এই চিঠিতে হজরত থানবি (রহ.) হাসাদ ও হিকদের পার্থক্য আলোচনা করেছেন। হাসাদ সম্পর্কে বলেছেন, ‘কারো ক্ষতির সংবাদ শুনে যদি মন খুশি হয়’ যেমন, কারো ঘরে চুরি বা ডাকাতির সংবাদ শুনে মনে হলো যে, ভালো হয়েছে তার সম্পদ কিছু কমেছে, কারো ব্যবসায় লোকসান হলো, এটা শুনে খুব আনন্দ লাগল যে, খুব ভালো হয়েছে। বড় বাড় বেড়েছিল এখন কিছুটা ঠাণ্ডা হবে। এগুলো হচ্ছে অন্যের নেয়ামত ধ্বংস হওয়ার আনন্দ। এটাও হাসাদের একটা প্রকার। এভাবে কারো ক্ষতিতে খুশি হওয়া হাসাদ।
এটা ‘কিনা’
কারো দ্বারা যদি আপনি কষ্ট পেয়ে থাকেন এবং এ কারণে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়, আর এই ঘৃণার কারণে তার ক্ষতিতে আপনার মনে আনন্দ জাগে, তা হলে একে হিকদ বলা হয়। অর্থাৎ, আপনার মনে কিনা রয়েছে। কিনার ব্যাখ্যা এই যে, কোনো ব্যক্তি আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, যার কারণে আপনার মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হয়েছে, কিন্তু যেমন, প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা ছিল তা নেয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই আপনার মনে চাপা ক্রোধ ও ঘৃণার সৃষ্টি হলো। এখন তার কোনো ক্ষতির সংবাদ আপনাকে আনন্দিত করেছে। আপনি তার ক্ষতি কামনা করছেন। এই অবস্থাটাকে কিনা বলা হয়। এই আলোচনা সামনে আলাদাভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ। হজরত থানবি (রহ.) এখানে শুধু হিকদ ও হাসাদের পার্থক্য বয়ান করেছেন। যার সারকথা এই যে, কারো ক্ষতির কারণে মনে আনন্দ জাগলে তাকে হাসাদ বলে। আর কারো দ্বারা কষ্ট পাওয়ার কারণে এই অবস্থাটা সৃষ্টি হলে একে হিকদ ও কিনা বলে।
একে দুর্বল করা চাই:
সামনে হজরত থানবি (রহ.) বলেন, তবে শুধু মানসিক প্রবণতার ওপর শাস্তি হবে না। অর্থাৎ, অন্তরে যে আনন্দ স্বভাবগতভাবে সৃষ্টি হয়েছে এটা যেহেতু ব্যক্তির কর্ম নয় তাই এর ওপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে শাস্তি দেওয়া হবে না। কিন্তু যদি এই প্রেরণার বশবর্তী হয়ে এমন কোনো কাজ করে যার দ্বারা তার কষ্ট হয় তা হলে শাস্তি ভোগ করতে হবে। আর এই কাজটা যেমন, ব্যক্তির নিজের কর্ম তেমনি তা না করাও তার ইচ্ছাধীন।
তবে ওই মানসিক প্রবণতাও দূর করা অপরিহার্য যাতে তা প্রবল না হয়ে যায়। এর উপায় এই যে, অন্তরের এই প্রবণতার ওপর লজ্জিত হবে এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা করবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করবে, আল্লাহ তায়ালা যেন তা দূর করে দেন এবং ওই ব্যক্তির সাহায্য করবে, চাই কাজ-কর্মের মাধ্যমে হোক, কিংবা অর্থের মাধ্যমে হোক অথবা দোয়ার মাধ্যমে হোক। এভাবে এটা স্তিমিত ও মৃতপ্রায় হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা হেফাজত করুন। হাসাদ বড় মন্দ প্রবণতা। আরো ভয়ের বিষয় এই যে, আমাদের আলেমদের মধ্যে এই প্রবণতা খুব বেশি পাওয়া যায়। কেননা ইলম এমন এক দৌলত যার প্রকৃতি ঊর্ধ্বগামী। এ জন্য অন্য কাউকে ইলম ও মকবুলিয়তের দিক থেকে অগ্রগামী হতে দেখলে অন্তরে হাসাদ সৃষ্টি হয়ে যায়।
শয়তানের গল্প:
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এর কাছ থেকে শুনেছি যে, এক ব্যক্তি শয়তানকে স্বপ্নে দেখল ফেরিওয়ালার সূরতে। অনেক গাট্টি তার কাঁধে। কিন্তু সেগুলো বড় বিচিত্র জিনিসে পরিপূর্ণ। কোনোটাতে পায়খানা, কোনোটাতে পেশাব, কোনোটাতে পুঁজ- এভাবে সারা দুনিয়ার সকল নাপাকি তার কাছে বিদ্যমান। আবার সকল পেটলাতেই বিভিন্ন ধরনের লেবেল লাগানো রয়েছে। যেমন, হাসাদ, কিনা, সম্পদের মোহ, পদ ও পদবির মোহ। ইত্যাদি।
রাস্তায় কোনো লোক তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এগুলো নিয়ে কোথায় চলেছ? শয়তান বলল, এগুলোর আমার ব্যবসার পণ্য। এগুলো বিক্রি করতে যাচ্ছি। লোকটি বলল, এই ময়লা আবর্জনা কে কিনবে? শয়তান বলল, এগুলো কোথায় বিক্রি হয় তা আমার জানা আছে। এই যে ‘সম্পদের মোহ’ লেবেল আঁটা পোটলাটা দেখছ, এটা বিক্রি হবে ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা এর খরিদ্দার। আর এই যে ‘পদমর্যাদার মোহ’ ও ‘হাসাদ’ লেবেল আঁটা পোটলা দেখছ এগুলো বিক্রি হবে আলেমদের কাছে। তারাই এর গ্রাহক। আল্লাহ তায়ালার কাছে পানাহ চাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন। আমিন।
ইলমের কারণে হাসাদ ও মর্যাদার মোহ সৃষ্টি হয়:
ইলমের সঙ্গে যদি ইখলাস না থাকে তা হলে ওই ইলমের কারণে ‘পদের মোহ’ সৃষ্টি হয়। আর তা থেকে সৃষ্টি হয় হাসাদ। কেননা যখন অন্যকে ইলমের দিক দিয়ে অগ্রগামী হতে দেখবে তখন তার অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি হবে যে, সে কেন আমার চেয়ে অগ্রগামী হয়ে গেল? কেন তার এত প্রসিদ্ধি ও সুনাম? কেন তার এত গ্রহণে যোগ্যতা? অন্যদিকে যদি ইলমের সঙ্গে ইখলাস থাকে, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য হয় তা হলে তো ‘হাসাদ’ ও ‘হুব্বে জাহ’ সৃষ্টি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং অন্যকে ইলমের দিক থেকে অগ্রগামী হতে দেখলে আনন্দ হবে। আল্লাহ তায়ালা নিজ রহমতে আমাদের সবাইকে ইখলাস দান করুন। আমিন।
হজরত মাওলানা ইদরিস কান্দলবি (রহ.) এর ইখলাস:
হজরত মাওলানা ইদরিস কান্দলবি (রহ.) আল্লাহ তায়ালা তার মরতবা বুলন্দ করুন-আমার বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি হজরত মাওলানা মুফতি শফি (রহ.) এর সহপাঠী ছিলেন। তাদের দু’জনের মধ্যে গভীর মুহাব্বত ছিল। এত বেশি মুহাব্বত ছিল যে, ওয়ালেদ সাহেবের প্রত্যেক কিতাবের দুটো করে কপি তার কাছে থাকত। তিনিও যেহেতু লিখতেন এ জন্য বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি তার কিতাবের যে নাম রাখতেন তিনিও ওই নাম রাখতেন। বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি তাফসিরের কিতাব লিখলেন মাআরিফুল কোরআন। তিনিও তার তাফসির গ্রন্থের নাম রাখলেন ‘মাআরিফুল কোরআন’। হজরত বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এক কিতাব লিখলেন ‘দাওয়ায়ে মির্জা’ নামে তো তিনিও ওই নামে কিতাব লিখেন। এ দুজনের কয়েকটি কিতাব একই নামে রয়েছে।
হাসাদের কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়:
তিনি লাহোরে থাকতেন। একবার আমি তার সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য লাহোরে গেলাম। পরিচয় দেয়ার পর বললেন, মৌলবি শফিকে আমার সালাম দিয়ো। মাওলানা কখনোই বলতেন না, মৌলবিই বলতেন। এরপর বললেন, মৌলবি শফির সঙ্গে আমার বায়ান্ন বছরের সম্পর্ক। আলহামদু লিল্লাহ, এই বায়ান্ন বছরের মধ্যে একবারের জন্যও আমাদের কারো মনে একচুল পরিমাণ হিংসা হাসাদ সৃষ্টি হয়নি। এরপর বললেন, বলো দেখি, একচুল পরিমাণ কোনো কিছু কেন সৃষ্টি হলো না? বললেন যে, মৌলবিদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মূল কারণ হলো হাসাদ। অমুক ব্যক্তি কেন আমার চেয়ে অগ্রগামী হয়ে গেল? এই হাসাদের কারণে অন্তরে বিদ্বেষ বিমুখতা সৃষ্টি হয় এবং সম্পর্ক নষ্ট হয়। আলহামদুলিল্লাহ, মৌলবি শফির সঙ্গে কখনো আমার হাসাদ হয়নি।
সারকথা এই যে, অন্তরে ইখলাস থাকলে হিংসা-হাসাদ নির্মূল হয়ে যায়। তাই হাসাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার বড় উপায় অন্তরে ইখলাস পয়দা করা। যতই ইখলাস পয়দা হতে থাকবে ততই অন্তর থেকে হাসাদ দূর গতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা আমাকে ও আপনাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আরো পড়ুন>>> হিংসা ও তার প্রতিকার (পর্ব-২)
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে