তারাবির নামাজের নিয়ম ও মাসয়ালা
পবিত্র রমজান মাসে এশার নামাজের পর যে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তারাবির নামাজ বলে। রমজানের সিয়ামের বিশেষ অনুষঙ্গ তারাবির সালাত। মুমিন বান্দারা যথাযথ গুরুত্ব ও ভাবগাম্ভীর্যতার সঙ্গে তারাবির সালাত আদায় করে থাকেন। দিনে রোজা রেখে রাতে দীর্ঘক্ষণ তারাবির নামাজের কষ্ট আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন।
পুরুষদের জন্য তারাবির নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নত। তারাবির নামাজে কোরআন শরিফ খতম করা সুন্নত আমল। নারীদের জন্যও ২০ রাকাত তারাবি সুন্নত। তারাবির নামাজের সময় হলো- এশার নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত।
পবিত্র রমজানের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতগুলোর অন্যতম এ নামাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজানে তারাবির নামাজ আদায় করেন, তার অতীতের গুনাহগুলো আল্লাহপাক ক্ষমা করে দেবেন। (বুখারি শরিফ)।
মূলত মাহে রমজানে এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর বিতরের আগে তারাবির নামাজ আদায় করতে হয়। সাধারণ নফল ও সুন্নতের চেয়ে অধিকতর মর্যাদাবান, গুরুত্বের দিক থেকে তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, যা ওয়াজিবের কাছাকাছি।
তারাবি আরবি শব্দ, যা তারবিহাতুন শব্দের বহুবচন; যার অর্থ হলো আরাম, প্রশান্তি অর্জন, বিরতি দেওয়া, বিশ্রাম নেওয়া ইত্যাদি। যেহেতু ২০ রাকাত তারাবির নামাজ প্রতি চার রাকাত অন্তর চার রাকাত নামাজের সমপরিমাণ সময় বিরতি দিয়ে আরামের সঙ্গে আদায় করা হয়, সেজন্য এ নামাজকে তারাবির নামাজ বলা হয়।
এ নামাজ আদায় না করলে অবশ্যই গুনাহগার হতে হবে। তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। কারণ, মাহে রমজান যেসব বৈশিষ্ট্যের জন্য মহিমান্বিত, তার মধ্যে অন্যতম হলো তারাবির নামাজ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) তারাবির সালাত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতেন বলে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আমাদের দেশে দুই ধরণের তারাবি প্রচলিত। একটি হলো সূরা তারাবি এবং অন্যটি হলো খতম তারাবি। সূরা তারাবি হলো পবিত্র কোরআনের যে কোনো সূরা দিয়ে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা।
খতম তারাবি হলো রমজান মাসে সম্পূর্ণ কোরআন সহকারে তারাবি আদায় করা। উভয় পদ্বতিই ইসলাম অনুমোদন করে। তবে খতমে তারাবিতে সওয়াব বেশি। সূরা তারাবির মাধ্যমে নামাজ আদায় করলেও নামাজ আদায় হবে।
তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম
এশার নামাজের চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে দুই রাকাত করে ১০ সালামে যে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। আর এ নামজকেই ‘তারাবির নামাজ’ বলা হয়।
তারাবি নামাজের নিয়ত
আরবি এবং বাংলা উভয়ভাবে নিয়ত করা যাবে। আরবি নিয়ত হচ্ছে, নাওয়াাইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রকাআতাই সালাতিত তারাবিহ, সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তাআলা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলায় নিয়ত হচ্ছে, আমি কেবলামুখি হয়ে দুই রাকাআত তারাবির সুন্নতে মুয়াাক্কাদাহ নামাজের নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার। (জামাআত হলে যোগ করতে হবে এ ইমামের পেছনে পড়ছি)।
তারাবির নামাজ কীভাবে পড়বেন
দুই রাকাত নামাজ আদায় করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা। আবার দুই রাকাত নামাজ পড়া। এভাবে ৪ রাকাত আদায় করার পর একটু বিশ্রাম নেয়া।
বিশ্রামের সময় তাসবিহ তাহলিল পড়া, দোয়া-দরূদ ও জিকির আজকার করা। তারপর আবার দুই দুই রাকাত করে আলাদা আলাদা নিয়তে তারাবি আদায় করা।
জামাতে তারাবি
ফরজ নামাজ ব্যতিত অন্য সকল নামাজ একাকী আদায় করা উত্তম। কিন্তু তারাবি নামাজ ব্যতিক্রম। তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা শরীয়ত সম্মত। বরং তারাবি একাকী আদায় করার চেয়ে জামাতবদ্ধভাবে আদায় করা উত্তম।
কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করেছেন এবং জামাতে আদায়ের ব্যাপারে তাকিদ দিয়েছেন। পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়া নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত।
তারাবির মাসায়েল
তারাবির নামাজ অতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতে মুআক্কাদা আমল। তাই তারাবির নামাজের প্রয়োজনীয় কিছু মাসআলা জেনে রাখা আবশ্যক। আমরা ধারাবাহিক ভাবে কিছু মাসআলা আলোচনা করবো-ইনশাআল্লাহ।
খতমে তারাবিতে উঁচু আওয়াজে বিসমিল্লাহ বলা
দেশের অনেক মসজিদে এখন খতমে তারাবি অনুষ্ঠিত হয়। খতমে তারাবির সময় হাফেজ সাহেবরা যে কোনো একটি সূরার শুরুতে উচ্চ আওয়াজে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম তেলাওয়াত করেন। এর কারণ হলো- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম কোরআনে কারিমের স্বতন্ত্র একটি আয়াত, যা দুই সূরার মাঝে পার্থক্য করার জন্য আল্লাহতায়ালা অবতীর্ণ করেছেন। আর তারাবরি নামাজে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের পুরো কোরআনের খতম শোনাতে চাইলে যে কোনো একটি সূরার শুরুতে উঁচু আওয়াজে বিসমিল্লাহ পড়তে হবে। অন্যথায় বিসমিল্লাহ না বলার কারণে মুসল্লিদের খতম অপূর্ণ থেকে যায়। আর ইমামের জন্য সব নামাজেই সূরা ফাতেহা এবং সব সূরার শুরুতে অনুচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ বলা মুস্তাহাব। -ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৩২৮
খতমে তারাবিতে সূরা ইখলাস একবারই পড়া
সমাজের প্রচলিত আছে যে, তারাবির সময় কোরআনে কারিম খতম করার ক্ষেত্রে সূরা ইখলাস তিনবার পড়ার। কিন্তু ইসলামি শরীয়তে এমন কোনো বিধান নেই। সাহাবা-তাবেয়িন থেকেও এমন কোনো আমলের প্রমাণ নেই। ইসলামি স্কলাররা এই আমলকে অপছন্দ করেছেন। সুতরাং তারাবিতে কোরআন খতমের সময় সূরা ইখলাস তিনবার পড়ার প্রচলনটি ঠিক নয়। তাই এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং অন্য সূরার মতো যথানিয়মে সূরা ইখলাস একবারই তেলাওয়াত করবে।
তারাবির নামাজ ছুটে গেলে করণীয়
ব্যস্ততার দরুণ অনেকেই নির্ধারিত সময়ে তারাবির নামাজের জন্য মসজিদে যেতে পারেন না। আবার অনেককে দেখা যায়, তারাবির নামাজ কয়েক রাকাত পড়ার পর মসজিদে যাচ্ছেন। এমন মুক্তাদির জন্য এশা ও তারাবির নামাজ আদায়ের নিয়ম হলো- প্রথমে এশার ফরজ ও সুন্নত আদায় করা। পরে ইমামের সঙ্গে তারাবির নামাজে অংশ নেয়া। তারাবির জামাত শেষে ইমামের সঙ্গে বেতর নামাজও জামাতে পড়ে নেওয়া। এরপর শুরুতে ছুটে যাওয়া তারাবির বাকি নামাজ আদায় করা।
যেহেতু রমজান মাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতের মাস, এ মাসে ইবাদত-বন্দেগির সওয়াব অনেক বেশি। তাই রমজানে নামাজ ও জামাতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই মসজিদে চলে যাওয়া উচিত।
তারাবির নামাজে শুধু তাশাহহুদ নয়, দরূদ এবং দোয়াও পড়তে হবে
অনেক মসজিদে তারাবির সময় ইমাম সাহেব নামাজের শেষ বৈঠকে এ পরিমাণ বসার পর সালাম ফিরিয়ে নেন, যে সময়ে শুধু তাশাহহুদ পড়া যায়। দরূদ শরীফ ও দোয়া মাছুরা পড়া যায় না। নামাজে এমন তাড়াহুড়া করা ঠিক না।
অন্য নামাজের মতো তারাবির নামাজের শেষ বৈঠকে দরূদ ও দোয়ায়ে মাছুরা পড়া সুন্নত। ইমাম-মুক্তাদি সবার জন্যই সুন্নত। তাই ইমামের উচিত শেষ বৈঠকে দোয়া-দরূদ এমন ধীরগতিতে পড়া যেন ওই সময়ের মধ্যে মুক্তাদিদের দরূদ ও দোয়ায়ে মাছুরা পড়া সম্ভব হয়।
তারাবির নামাজে দরূদ ও দোয়া মাছুরা পড়তে হবে না- এমন কোনো নিয়ম নেই। ইমাম-মুক্তাদি সবার জন্য তা পড়া সুন্নত। -আল বাহরুর রায়েক: ২/৬৯
তারাবির নামাজে ভুলে এক সালামে চার রাকাত পড়ে ফেললে করণীয়
একা একা তারাবির নামাজের সময় ভুলে কেউ যদি একসঙ্গে চার রাকাত আদায় করে, অর্থাৎ দুই রাকাতের পর তাশাহহুদ পড়ে দাঁড়িয়ে আরও দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে; তাহলে তার নামাজ হয়ে যাবে। এখানে চার রাকাত নামাজ পড়া হয়েছে বলে ধরা হবে।
তবে তারাবির নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে একসঙ্গে চার রাকাত পড়া ঠিক না। -আল বাহরুর রায়েক: ২/৬৭