সমুদ্রের বিস্ময় ও সংকট: চলতি বছরে মহাসাগরের সেরা ১০ ছবি
কৌতূহলী সিল, সন্তানকে আগলে রাখা সি-হর্স বাবা কিংবা সচরাচর চোখে না পড়া গভীর সমুদ্রের প্রাণী—‘ওশান ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার ২০২৬’ প্রতিযোগিতার সেরা ছবিগুলোতে উঠে এসেছে সমুদ্রজগতের এমনই বিস্ময়কর কিছু মুহূর্ত।
প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফটোগ্রাফারদের সমুদ্রের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এবারের নির্বাচিত ছবিগুলো শুধু মহাসাগরের সৌন্দর্যই তুলে ধরেনি, বরং এর বাসিন্দাদের জীবনসংগ্রাম এবং সমুদ্রের সামনে থাকা নানা চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছে।
প্রথমবার সাগরে
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সি লায়ন আইল্যান্ডের অগভীর রক পুলে সমুদ্রে প্রথমবারের মতো নামা একটি কৌতূহলী সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিলের বাচ্চাকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন ফটোগ্রাফার ম্যাথিউ স্মিথ। অগভীর জলে প্রাণীটির স্বতঃস্ফূর্ত অনুসন্ধানী আচরণ ছবিটিকে দিয়েছে বিশেষ প্রাণবন্ততা।
.png)

বাবার ভূমিকা
প্রতিযোগিতার সার্বিক বিজয়ী ছবিটি তুলেছেন জুলিয়েন আন্তন। এতে দেখা যাচ্ছে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ সি-হর্সের মুখোমুখি একটি ছোট্ট বাচ্চাকে।
বেশিরভাগ প্রজাতির সি-হর্সের ক্ষেত্রেই গর্ভধারণ, সন্তান জন্ম দেওয়া এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব পুরুষের। ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার মুরিয়ার অগভীর পানিতে ধারণ করা ছবিটি প্রাণিজগতের পিতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ তুলে ধরে।

চোখের কাছে
বিশাল এক ব্ল্যাক সি-বাসের চোখের ভেতরে বাস করছে কোপেপড নামের ক্ষুদ্র পরজীবী ক্রাস্টেসিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে সান্তা ক্যাটালিনা দ্বীপের কাছে এই অস্বাভাবিক দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন স্টিফেন লোপেজ।
প্রায় ৫০ বছর আগে এই অঞ্চলে মাছটি বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে এর সংখ্যা আবার বাড়ছে।

চোরাগোপ্তা হামলা
ফিলিপাইনে আন্দ্রেয়া মিচেলুত্তির তোলা ছবিতে দেখা যায়, একটি লাল স্করপিয়নফিশ একটি লিজার্ডফিশকে কামড়ে ধরে আছে। নাটকীয় এই মুহূর্তটি স্করপিয়নফিশের আড়াল থেকে শিকার করার কৌশল এবং প্রবালপ্রাচীরে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রামকে তুলে ধরে।

শান্তশিষ্ট এক দৈত্য
মেক্সিকোর ২০২৫ সালের সার্ডিন রানের সময় ছোট একটি গাড়ির আকারের বিশাল সামুদ্রিক সানফিশের দেখা পেয়েছিলেন ফটোগ্রাফার অনিতা ভার্দে। অপ্রত্যাশিত সেই সাক্ষাৎই ধরা পড়ে তার ক্যামেরায়।
তিনি বলেন, নীল জলের মধ্য দিয়ে এটি যখন আমাদের দিকে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন জ্বলজ্বল করছে—ঠিক পানির নিচে একটি বিশাল চাঁদ উঠেছে। আপনি মাছটির চোখের দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারবেন না। এটি অদ্ভুত রকমের সুন্দর।

গভীর সমুদ্রের এক দর্শনার্থী
জাপানের ওসেজাকি উপকূলে শীতকালীন ব্ল্যাক-ওয়াটার ডাইভের সময় এই ছবিটি তুলেছেন মিৎসুনো কাওয়াই। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি অল্পবয়সী রিবনফিশ।
জীবিত অবস্থায় অল্পবয়সী রিবনফিশকে খুব কমই দেখা যায়। কারণ, এরা প্রায় ৯০০ মিটার (২,৯৫০ ফুট) গভীরতায় বাস করে। এমন একটি অল্পবয়সী রিবনফিশের দৈর্ঘ্য হতে পারে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। তবে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় এরা ১.৮ মিটার (৬ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

দলবদ্ধ শিকারি
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের বালুকাময় সমুদ্রতলের ওপর দিয়ে একসঙ্গে ভেসে চলেছে পাঁচটি স্পটেড ইগল রে। এই শৈল্পিক দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন জন কোউইটজ।
শিকারের সন্ধানে এই রে মাছগুলো প্রায়ই দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। বালির নিচে লুকিয়ে থাকা শামুক-ঝিনুকজাতীয় প্রাণী ও ক্রাস্টেসিয়ান খুঁজে বের করতে তারা শরীরে থাকা ইলেকট্রোরিসেপ্টর ব্যবহার করে।

মুখে সন্তান পালন
ইন্দোনেশিয়ার মাওয়ালিতে সুলেমান আলাতিকির তোলা অসাধারণ ক্লোজ-আপ ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি পুরুষ বাঙ্গাই কার্ডিনালফিশকে। না খেয়ে প্রায় ১০ দিন ধরে সে সদ্য প্রস্ফুটিত বাচ্চাদের নিজের মুখের ভেতরে আগলে রেখেছে।
মাছটির এই বিশেষ ‘মাউথ ব্রুডিং’ কৌশল অল্পবয়সী মাছগুলোকে শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, যতক্ষণ না তারা আরও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার মতো সক্ষম হয়ে ওঠে।

লবস্টারের মৌচাক
যুক্তরাজ্যের প্যাডস্টোর ন্যাশনাল লবস্টার হ্যাচারিতে প্রতি বছর হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও ভঙ্গুর বাচ্চা লবস্টার বা সামুদ্রিক গলদা চিংড়ি বড় করা হয়। ফ্রান্সেসকা পেজের তোলা ছবিতে ধরা পড়েছে সেই ছোট্ট প্রাণীগুলোরই এক ঝলক।
প্রাকৃতিক পরিবেশে ২০ হাজার বাচ্চা লবস্টারের মধ্যে মাত্র একটি পূর্ণবয়স্ক হতে পারে। তবে হ্যাচারিতে বেড়ে ওঠা বাচ্চাগুলোর প্রজনন বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১,০০০ গুণ বেশি।

শিকারের নির্মম পরিণতি
ডেনমার্ক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত স্বশাসিত ফ্যারো আইল্যান্ডসে একজন শিকারির হাতে পাইলট তিমি হত্যার শিকার হওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন কার্স্টেন মিশেলস।
‘গ্রিন্ডাড্রাপ’ নামের ঐতিহ্যবাহী প্রথার অংশ হিসেবে পাইলট তিমির পালকে সৈকতের দিকে তাড়িয়ে এনে হত্যা করা হয়। এই প্রথা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ছবিটি সেই বিতর্কের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেয়—ছোট আকারের তিমি শিকারও গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: বিবিসি