দুর্নীতি আর সামাজিক অবক্ষয় উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ
আচ্ছা ভাবুন তো - দুর্নীতি না হলে কেমন হতো বাংলাদেশ? রেলে দুর্নীতি না হলে রেল যোগাযোগ হতো গণমুখি নিরাপদ পরিবহন। বিদ্যুতে, ওয়াসায় দুর্নীতি না হলে আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ পেতাম ঠিকঠাক মতো। মন্ত্রী, এমপিসহ জন প্রতিনিধিরা দুর্নীবাজ না হলে অথবা তারা দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় না দিলে- এদেশের রাস্তাঘাট আরো কত উন্নত থাকতো সহজেই ভাবা যায়। রোড, ব্রিজ, কালভার্টে ভরপুর থাকতো বাংলাদেশ।
ঢাকার ফ্লাইওভারগুলো সবচেয়ে কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে দুর্নীতি না হওয়ার কারণেই। দুর্নীতি না হলে সারাজীবন চাকরির সম্বল পেনশনের টাকা তুলতে ফাইল আটকে থাকতো না। নিয়োগে দুর্নীতি না হলে- সহজে চাকরি পেত নাগরিকরা। নীতিবান মানুষের মর্যাদা সমাজে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলে দুর্নীতির প্রবণতা কমে যেত।
স্বাধিনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে। দুর্নীতি না হলে এই দেশ আরো বিশ বছর আগে মালয়েশিয়ার মতো দেশে উন্নীত হতো। দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য আসে সরকারিভাবে সেগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা। এনজিওরা যে সাহায্য পায়, দেশের গরিব জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। উচু স্তর থেকে নিচু স্তরে ভাগ-বাটোয়া করে প্রায় ৭৫ শতাংশ খেয়ে ফেলে দায়িত্ব প্রাপ্তরা। বাদবাকি ২৫ শতাংশ নিয়ে টানাহেঁচরা করে জনগণ যা পায় তা দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হয়না।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত এসব সাহায্যের ২৫-৩৫ ভাগ যদি যথাযথ স্থানে পৌঁছানো হতো তাহলে দেশের চেহারা ১০ বছরে পাল্টে যাবে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে সাহায্য আসছে আর ভোগবাদীরা খেয়ে-পড়ে যা থাকে তার ছিটাফোটা পাচ্ছে আমজনতা। এই দুর্নীতি কবে বন্ধ হবে?
দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে গোটা বাংলাদেশ। অফিসের কেরানী থেকে বিগ বস, বিদ্যুৎ বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, ওয়াসা, ভুমি অফিস থেকে শুরু করে সকল দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রশাসকী অফিস, সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন কাউন্সিলর পর্যন্ত দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত। কোন কোন অফিসের চেয়ার টেবিল পর্যন্ত নাকি ঘুষ খায়- এমন কথারও প্রচলন আছে।
আমাদের মন্ত্রী-এমপি, তাদের পুত্ররা, উপদেষ্টা মহাশয়রা দুর্নীতির সাথে জড়িত। দুর্নীতির সাথে জড়িত সকল পেশার মানুষ। তারপরও কি সৎ মানুষ নেই! সংখ্যাধিক্যে সৎ-নিষ্ঠাবান মানুষই বেশি। কিন্তু অসৎ, দুর্নীতিবাজদের দাপটে তারা কোনঠাসা।
২০০৭ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের বনখেকো ওসমান গণির কাহিনী নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। সেই বন কর্মকর্তা ওসমান গণি’র দুর্নীতির অনুসন্ধানে তার বাসায় বালিশের ভিতর, চালের মটকায়, বিছানার তলে টাকার পাহাড় পাওয়া গিয়েছিলো। বন কেটে সাবার করে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে টাকার পাহাড় বানিয়ে তিনি চিরসুখী হওয়ার স্বপ্নপুরী বানাতে চেয়েছিলেন।
আমরা সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুকের কাহিনী জেনেছি। সেই ওমর ফারুক আমার স্কুল জীবনে ক্লাশমেট, আমি লজ্জিত। শুধু তারা কেন, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা থেকে পিয়ন পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার খবর জানা যায় প্রায়শই। এইসব খবর দুর্নীতিপ্রবণ বাংলাদেশের নমূনা মাত্র।
বিগত তত্বাধায়ক সরকারের সময়ে যেভাবে দুর্নীতিবাজ আর অবৈধ দখলবাজদের ধরপাকড় শুরু হয়েছিলো এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালালে সরকারের অর্থ ভান্ডোটা অনেক শক্তিশালী হয়ে যেত। আন্দাজ করে বলা যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা গেলে এদেশে রাস্তা-ঘাটে টাকার বস্তা কুড়িয়ে পাওয়া যাবে। ছিনতাইকারীদের আর কষ্ট করে পথে-ঘাটে মানুষ আটকাটে হবেনা।
আমার কাছে মনে হয়- প্রতিবছর দুর্নীতিবাজদের একটা তালিকা প্রকাশ করা দরকার। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের সমাজে প্রকাশ্য করা দরকার। সামাজিকভাবে তাদেরকে বয়কট করা, ধিক্কার দেয়া দরকার। আচ্ছা সরকার তো এই কাজ কখনোই করবেনা। আমাদের দেশের মিডিয়া তো পারে এ কাজটি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে। বছরের পয়লা তারিখে সারাবছরের সালতামামি প্রকাশিত হয়। সারা বছরের দুর্নীতিবাজদের একটা তালিকা প্রকাশ করলে দেখা যাবে সমাজের মানুষ এদের ধিক্কার দিতে শুরু করবে।
সামাজিকভাবে ব্যক্তি ও পরিবারের এইসব দুর্নীতিবাজরা ধিকৃত হবে। সন্তান যখন পিতাকে প্রশ্ন করবে- তখনই তার চারিত্রিক সংশোধনের বাধ্যকতা তৈরি হবে। একইসাথে নীতিবানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেও কমবে দুর্নীতির প্রবণতা।
লোকে বলে এদেশের সমৃদ্ধির বারো আনাই খেয়ে ফেলে দুর্নীতি। সরকারি কাজে দুর্নীতির ঠেলায় সুনীতি বা নীতিবানদের চরম দুর্দশার শেষ নেই। বেসরকারি খাতেও এ রোগ ছড়িয়ে গেছে ক্যান্সারের মতো। আমাদের সরকারগুলোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, স্বেচ্ছাচারিতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারে কুলষিত হয়ে দেশ দুর্নীতির ভাগারে পরিণত হয়েছে। নীতিভ্রষ্টতা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ছড়িয়ে গেছে সর্বসাধারণের মাঝে। এরফলে ধ্বংস হয়েছে সকল প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলছে নিয়ম ভাঙ্গার মহোৎসব।
আমাদের জনপ্রতিনিধিরা হরিণ পুষেন মনের সুখে। চড়েন দামী গাড়িতে, থাকেন আলিসান বাড়ি করে। আর ব্যাংকের টাকার কথা কী বলব? তারপরও তাদের ক্ষুধা মিটেনা। সাতপুরুষ বসে খাওয়ার মতো সম্পদ ভোগ দখল করে থাকলেও লোভ সামলাতে পারেনা তারা। যারফলে বন খায়, ধন খান, হাওর-বিল-খাল ও নদী খায়। খাওয়ার লিপ্সার যেন শেষ নাই। কত ক্ষুধা আছে মানুষের পেটে?
একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে যথেচ্ছারভাবে অর্থ লুটপাট হয়। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে টাকা ফেরত না দেয়াটা একটা দম্ভের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের টাকা নিয়ে বাড়িগাড়ি, বিত্ত-বৈভবে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন ঋণ খেলাপিরা। দুর্নীতি আর লুটেরা বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের একশ্রেণীর কিছু মানুষের কাছে চলেগেছে সব টাকা। তারা দেশে সাত পুরুষের ভোগবিলাশের অঢেল সম্পদ রেখেও তৃপ্ত নন। দুর্নীতির অভিযানে ধরা খেয়ে মারা পড়ার ভয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে গড়ে তুলছেন বাড়ি ও ব্যবসাপাতি।
এবার দুর্নীতির প্রমাণ সম্পর্কে কিছু তথ্য দিই আপনাদের। প্রকাশিত এক খবরে জানাগেছে- বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অঢেল গোপন অর্থ আছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে। বলা হয়েছে, ঐ দ্বীপাঞ্চলে অর্থ রেখে ব্যবসার তালিকার বাংলাদেশের কমপক্ষে ২০ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও প্রভাশালী রাজনীতিকের নাম আছে। রির্পোটে বলা হয়, সেখানে সারা বিশ্বের ব্যবসায়ী, পুজিপতিরা নিজ দেশে কর ফাঁকি ও দুর্নীতির টাকা লগ্নি করছেন।
খবরে জানাগেছে, মালয়েশিয়া সরকারের মাই সেকেন্ড হোম প্রোগ্রামের আওতায় এ পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে প্লট-ফ্ল্যাট কিনেছেন সাত হাজার বাংলাদেশী। পাচারকারীদের তালিকায় আছে- ক্ষমতাসীন ও বিরোধি দলের মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
হায়রে টাকা! আমার দেশের মানুষ একবেলা খাবার যোগার করতে কতনা পরিশ্রম করে। কত ধরণের কাজ করে। এই দেশেরই কারো কারো টাকার পাহাড় দেখে মনে টাকার কোনো মা-বাপ নেই।
দুর্নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে আমাদের কিছু করা দরকার। কারণ এই দুর্নীতি আর সামাজিক অবক্ষয়ই বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান এক বিবৃতিতে বলেছিলেন- ৫০০ জন দুর্নীতিবাজকে জেলে পুড়তে পারলে নিজেকে সফল ভাবতাম।
প্রতি বছর অন্তত ১০০ জন দুর্নীতিবাজকে সাজাকে সাজা দেয়া গেলে সমাজে বড় ধরণের প্রভাব পড়তো। আচ্ছা, দুদক তো পারতো বছরে ১০০ জন দুর্নীতিবাজের শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে। কেন হয়না, কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলাচ্ছেন না। আদর্শের রাজনীতি যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পুলিশের দুর্নীতি থামানো যাবেনা। কারণ পুলিশ তো রাজনীতিবিদদের হাতিয়ার। অতএব এ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে- দুর্নীতিকে না বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই চেতনা জাগিয়ে তোলতে হবে। অনেকে বলেন এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষার্থীদের দুর্নীতিকে না বলার শিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু কারা দিবেন সে শিক্ষা? শিক্ষক? শিক্ষকরাই তো এখন দলবাজি আর নৈতিকতা বিমুখ হয়ে টাকা পেছনে দৌড়াচ্ছেন। তারপরও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কারণ সমাজে ও দেশে অস্থিরতা এবং অবৈধভাবে সম্পদশালী হওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এ অবস্থার পরিবর্তন আনতেই হবে।
সেজন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। সকল পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত সততা প্রদর্শন খুবই জরুরি। দেশের প্রতি ভালবাসা, পরিবারের প্রতি ভালবাসার মনোজগৎ তৈরি করা খুব জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়া জরুরি। আসুন আমরা সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে ভুমিকা রাখি।
এস এম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক, [email protected]