ঢাকা,  সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৮, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

মাদক পাচার ও অপব্যবহার রোধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নে কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ সংশোধন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইনে মাদক পাচার, মাদক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানানো হয়েছে।

সংশোধিত আইনে অনলাইনে মাদক পাচারের দায়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ অপরাধ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত নির্দিষ্ট কিছু মাদক অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধানের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর কিছু মাদক অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত মাদক শনাক্তকারী কুকুর, উন্নত পরীক্ষাগার এবং আটক ব্যক্তিদের রাখার সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক পরীক্ষার নির্ভুলতা বাড়ানো ও জালিয়াতি ঠেকাতে দেশের প্রতিটি জেলায় উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং এর মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের বিচারের আওতায় আনতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিযান শুধু খুচরা বিক্রেতা ও মাদক বহনকারীদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাদক ব্যবসার অর্থে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়েও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, মাদক কারবারিরা তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করতে এবং নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করছে। মাদক-সংশ্লিষ্ট আর্থিক অপরাধে বেনামি সিমকার্ড, একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড (ওটিপি), হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থ পাচার শনাক্ত করতে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) কারিগরি পরামর্শে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাতে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৪৪ হাজার ২৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অপরাধের মধ্যে মাদক পাচার, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ হাজার ১৮৭ জন, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ।

এ সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ৬ হাজার ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪ হাজার ২৫১ জন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) গ্রেপ্তার করেছে মোট ২ হাজার ৪৩৭ জনকে। তাঁদের মধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮০৮ জন।

সরকারের মতে, এসব অভিযান মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের ব্যাপ্তি তুলে ধরে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে।

মাদক কারবারের পরিবর্তিত ধরন মোকাবিলায় কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার উত্তরা এলাকায় কেটামিন উৎপাদনের একটি পরীক্ষাগার শনাক্তের ঘটনাকে অপরাধী চক্রের উন্নত কৌশল ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। কেটামিন একটি অবেদনকারী ওষুধ, যার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ড, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন মন্ত্রী। সিনথেটিক, সেমি-সিনথেটিক মাদক এবং নতুন ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মাদকাসক্তিকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা ২৫০টিতে উন্নীত করা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো, মাদকের সামাজিক ক্ষতি কমানো এবং তাঁদের সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।

তরুণদের মাদক ও জুয়া থেকে দূরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মাদক ও জুয়াসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো একক দেশ, সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে মাদকের ভয়াবহতা নির্মূল করা সম্ভব নয়।

সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনায় তাই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও বাজেয়াপ্ত, আধুনিক তদন্তপ্রযুক্তি, আর্থিক লেনদেন অনুসরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমকে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর/জেডআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!