এ অবস্থায় নানা শ্রেণিপেশার মানুষের মনে প্রশ্ন- বাংলাদেশ কেন এতটা পিছিয়ে?
যেভাবে হয় পাসপোর্ট র্যাংকিং
লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত সূচকে বিশ্বের পাসপোর্টগুলোর মান জানা যায়। গত ১৯ বছরের নথির ভিত্তিতে প্রতি বছর ‘হেনলি পাসপোর্ট সূচক’ প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংগঠনের (ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন) নথির ভিত্তিতে ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট নিয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়।
.png)
এক্ষেত্রে পৃথিবীর ২২৭টি গন্তব্যে যেতে পারার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। যেই দেশের পাসপোর্টধারীরা বিনা ভিসায় সবচেয়ে বেশি দেশে যাতায়াত করতে পারে, সেই দেশের পাসপোর্ট তত শক্তিশালী।
অন-অ্যারাইভাল ভিসায় নিরূপণ হয় পাসপোর্টের র্যাংকিং
কতটি দেশের সঙ্গে অন-অ্যারাইভাল ভিসা আছে, তার ওপর নির্ভর করছে একটি দেশ পাসপোর্ট র্যাংকিংয়ে কতটা উপরে থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কতটা দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যাচ্ছে, সেটার ওপর নির্ভর করে পাসপোর্ট র্যাংকিং হয়।
সবশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৪০টি দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পায়। আর র্যাংকিংয়ের এক নম্বরে থাকা সিঙ্গাপুর ১৯৫টি দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পায়। এ তালিকায় সিঙ্গাপুরের চেয়েও পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহির্গমন ও পাসপোর্ট অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমেরিকাতো আমাদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেবে না। এই ভিসার জন্য একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের চুক্তি হয়। আমরা ৩৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছি। তবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কাজেই এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার কেউ অন্য দেশে গেলে তার পাসপোর্ট এতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের কেউ গেলে তাকে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়।
যারা পর্যটক হিসেবে বিভিন্ন দেশে যান, তাদের উৎসাহিত করতেই অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া হয়। এটির মেয়াদ থাকে ৯০ দিনের মতো। এই সময়ের মধ্যে একজন পর্যটককে ওই দেশ ছাড়তে হয়।
নিয়মনীতি মেনে চললে সহজ হয় অন-অ্যারাইভাল ভিসা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সাব্বির আহমেদ চৌধুরী বলেন, র্যাংকিং মূলত নির্ভর করে যেসব বাংলাদেশি বিদেশে যাচ্ছেন এবং সেখানে তাদের আচার-ব্যবহারের ওপর। যেমন র্যাংকিংয়ে প্রথম দিকে থাকা একটি দেশ হচ্ছে জাপান। কারণ দেশটির কোনো নাগরিক যখন জাপানি পাসপোর্ট নিয়ে কোনো দেশে যান, তখন ভিসার নিয়মনীতি তারা ভালোভাবে মেনে চলেন। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যখন তাদের কোনো দেশ থেকে ভিসা দেওয়া হয় এবং ঐ সময়ের মধ্যে তারা দেশত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, যদি মাল্টিপল এন্ট্রি থাকে- যেমন আমেরিকা পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা দেয়। কিন্তু ঢোকার পর তারা একটি সিল মেরে দেয় যে প্রথম প্রবেশের পর ৬ মাস কিংবা ৩ মাসের মধ্যে তাকে ফেরত যেতে হবে। এখন ঐ সময়ের মধ্যে যদি দেশ না ছাড়ে, তখন সে ভিসা ডিফল্টার হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন সে ঢুকতে যাবে, তখন ভিসা বৈধ থাকলেও দ্বিতীয়বার তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। কারণ সে নিয়ম ভঙ্গ করেছে। আবার বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে কেউ সেখানে গেল, কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সে সেখানে থাকছে। এর অর্থ- সে অবৈধ হয়ে গেছে। এতে একটি দেশের পাসপোর্টের মূল্য কমে যায়।
মানবপাচারের ঘটনায় পাসপোর্টের মান কমে না
মানবপাচারের সঙ্গে পাসপোর্টের র্যাংকিং কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে কি না- জানতে চাইলে সাব্বির আহমেদ চৌধুরী বলেন, মানবপাচার একটা ভিন্ন বিষয়। মানবপাচার সরকারের সম্মতিতে হয় না। যারা মানবপাচার করে, তারা নিজ দেশ এবং যে দেশে যাচ্ছে, দুই দেশের সরকারকেই ধোঁকা দিচ্ছে। এতে যে দেশ থেকে যাচ্ছে, সেই দেশের জন্য অবশ্যই বদনাম তৈরি হয়।
পাসপোর্ট র্যাংকিং বাড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সাব্বির আহমেদের মতে, একটি দেশের নাগরিকের শৃঙ্খলাবোধের ওপর নির্ভর করে সেই দেশের পাসপোর্টের গুরুত্ব তৈরি হয়। যেমন কোনো জাপানিকে দেখবে সজ্ঞানে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেই দেশে অবস্থান করে না। এ কারণে তাদের পাসপোর্টের মূল্য বেশি।
এ বিষয়ে সচেতনতার বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশার কথা হলো কোনো দেশে অবৈধভাবে অবস্থানের বিষয়ে বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আবার আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হচ্ছে। এসব কারণে বড় দেশগুলোতে গিয়েও বাংলাদেশিরা ফিরে আসছেন। এ কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে।