তথ্যমতে, দেশে ক্ষতিকর পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয় ২০ বছর আগে। নানা সময় চালানো হয় অভিযান, করা হয় জেল-জরিমানাও। তবুও কমেনি পলিথিনের ব্যবহার, বরং দিনদিন বাজার সয়লাব হচ্ছে নিষিদ্ধ এই পণ্যে। ফুটপাথ-বাসাবাড়ির ময়লা ফেলা থেকে শুরু করে শপিংমল, বাজার, খাবারের হোটেল, চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও সবজি বেচাকেনায় অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে পলিথিনের ব্যাগ।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশ বাঁচাতে ২০১৮ সালে পাট থেকে তৈরি সোনালী ব্যাগ বাজারজাত করার একটি পাইলট প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু সেই প্রকল্পের পরিসর খুব বেশি বড় নয়। যে কারণে উৎপাদিত পাটের সোনালী ব্যাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়।
.png)
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও সোনালী ব্যাগের উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমেদ খান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এ ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের পাশাপাশি বিশ্বেও পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগের ব্যাপক চাহিদা দেখা দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ ব্যাগ দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা সম্ভব। তৈরি পোশাকের মতো সোনালী ব্যাগ দিয়েও বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করা সম্ভব।
বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় সোনালী ব্যাগ উৎপাদনের জন্য। সেই টাকায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য কেনা হয়েছে। রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলেই তৈরি হয় সোনালী ব্যাগ। এ কারখানায় প্রতিদিন হাজারখানেক সোনালী ব্যাগ উৎপাদিত হয়। মতিঝিলের বিজেএমসি কার্যালয় থেকে প্রতিটি ব্যাগ ১০ টাকায় কেনা যায়। এছাড়া বিভিন্ন দূতাবাসে নমুনা হিসেবেও পাঠানো হয় এ ব্যাগ।
পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ কেন হচ্ছে না? এর নেপথ্যে কারণগুলো ঠিক কী- এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সিংহভাগ নাগরিক পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন বন্ধের পক্ষে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিকল্পের অভাবে নিষিদ্ধ পলিথিনে সয়লাব হয়ে আছে বাজার। আবার পলিথিন সহজলভ্য ও সস্তা। এক কেজি পলিথিন কিনতে খরচ হয় ১৫০-১৮০ টাকা। আর পাটের ব্যাগ প্রতিটির দাম কমবেশি ৫০ টাকা। এ কারণে পলিথিনের ব্যবহার কমছে না।

বারবার অভিযানে চালিয়েও কেন পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না? এমন প্রশ্নে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আফরোজা রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, শুধু অভিযান চালিয়েই পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতাও জরুরি।
তিনি আরো বলেন, আমরা মনিটরিং টিমের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাই। অভিযানকালীন অভিযুক্তরা ধরা পড়লে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়।
এ বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেয়া খান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমরা পলিথিনের সস্তা বিকল্প আনতে প্রকল্প হাতে নিয়েছি।
হাতিরপুল বাজারে আসা ক্রেতা ফয়সাল ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, পলিথিনের ব্যাগ সহজলভ্য, স্থায়িত্ব বেশি ও পানিরোধক। বৃষ্টিতে পলিথিনের ব্যাগে যেভবে মোবাইল-মানিব্যাগসহ মূল্যবান জিনিস নিরাপদে রাখা যায়, কাগজ কিংবা পাটের ব্যাগ দিয়ে তা সম্ভব নয়।
পলিথিন ব্যবসায়ী রবিউল হক বলেন, অল্প পুঁজিতে পলিথিনের ব্যবসা করে অনেক লাভবান হওয়া যায়। এ কারণে অনেকেই এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন। পলিথিন উৎপাদনের মেশিন দেশেই পাওয়া যায়। মাত্র ১৫ লাখ টাকা খরচ করে ফুলসেট মেশিনসহ কারখানা স্থাপন করা যায়। সেই কারখানা থেকে মাসে ২-৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) তথ্যানুসারে, রাজধানীসহ সারাদেশে দেড় হাজারের বেশি নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকা ও বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে রয়েছে ৭ শতাধিক কারখানা। এসব কারখানায় দৈনিক উৎপাদিত ৫০ লাখের বেশি পলিথিন ব্যাগ সারাদেশে সরবরাহ করা হয়।
ভোক্তা অধিকার ও পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫-এর আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ পলিথিনসামগ্রী উৎপাদন করে তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। সেই সঙ্গে পলিথিন বাজারজাত করলে ৬ মাসের জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, পরিবেশকে বাঁচাতে হলে প্লাস্টিকের বিকল্প পাটের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে তা হতে সস্তায়। একই সঙ্গে কঠোর মনিটরিং চালাতে হবে যেন মানুষ পলিথিন ব্যবহার করতে না পারে। এক্ষেত্রে মানুষই বিকল্প খুঁজে নেবে।
জানা গেছে, বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখের বেশি এবং বছরে প্রায় ৫ লাখ কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর মাত্র ১ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং সমুদ্রে ফেলা হয় ১০ শতাংশ। এসব পলিথিন ব্যাগ ১০০ বছরেও পচে না ও মাটির সঙ্গে মেশে না। মানুষ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক পাখি, জীববৈচিত্র্য ও জলজপ্রাণী এই অপচনশীল পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার।
সোশ্যাল সার্ভিসেস অর্গানাইজশন (এসডিও) এর তথ্যানুসারে জানা গেছে, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ জমা হচ্ছে। ব্যবহৃত পলিথিন গলিয়ে আবার ব্যবহার করায় এতে রয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল, যা থেকে ক্যানসার, চর্মরোগ, লিভার, কিডনিসহ জটিল রোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
আরো জানা গেছে, এক টন পাট থেকে তৈরি থলে বা বস্তা পোড়ালে বাতাসে ২ গিগা জুল তাপ এবং ১৫০ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে এক টন পলিথিন ব্যাগ পোড়ালে বাতাসে ৬৩ গিগা জুল তাপ এবং ১৩৪০ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, শুধু ঢাকায় ১০০ কোটি পলিথিন ব্যাগ ভূপৃষ্ঠের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে মাটির নিচেও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন স্তর, যা ভূপৃষ্ঠে স্বাভাবিক পানি ও অক্সিজেন প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে জমির শস্য উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস করছে।