পারিবারিক সম্পর্কের গাঁথুনি দৃঢ় ও সুনিবিড় করবেন যেভাবে
ঐতিহ্যগতভাবে, বাংলাদেশে একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থার প্রচলন ছিল, যেখানে দাদা-দাদি, চাচা-চাচী, ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা একসঙ্গে বসবাস করত। এই ব্যবস্থা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার একটি শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করত। কিন্তু আধুনিক সমাজে এই পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং একক পরিবার বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবারে যোগাযোগের অভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক সহানুভূতির অভাবের কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
পারিবারিক সম্পর্কের গাঁথুনি যার যতটা সুনিবিড় ও দৃঢ়, জীবন তার কাছে ততটা উপভোগ্য। প্রতিটি মানুষের জীবনে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। মা, বাবা, ভাই, বোন, কিংবা স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তৈরি হয় একটা গোটা পরিবার। আবার শুধু স্বামী-স্ত্রী কিংবা বোন ও ভাই মিলে পরিবার হতে পারে।

- দূরত্ব কমাতে সম্পর্কগুলোর যত্ন নিতে হবে। পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর মহামন্ত্র হলো সবাই একসঙ্গে করে মজা পাওয়া যায় এমন কোনো কাজ খুঁজে বের করা।
১. কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর সবাই মিলে হাঁটতে যাওয়া। এতে সারাদিন যা যা ঘটলো তা একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
২. পিতা-মাতা কোন রকম শর্ত ছাড়াই সন্তানের ভাল দিকগুলো নিয়ে কথা বলুন। উৎসাহ দিন। শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভাল ফল বা তার অর্জনগুলোকে নয়, মানুষ হিসেবে তার যে ভাল গুণাবলিগুলো রয়েছে সেগুলো খুঁজে বের করুন এবং প্রশংসা করুন।
৩. শরীরচর্চাকে একটি পারিবারিক আয়োজনে পরিণত করা। পরিবারের সবাই মিলে যে কোনো ধরণের ব্যায়াম করুন। এতে করে সন্তানদের সঙ্গে কেবল যে সুন্দর সময় কাটাতে পারবেন তা নয়, তাদের মধ্যে শরীরচর্চার সু-অভ্যাসও গড়ে উঠবে।
৪. পরিবারের প্রত্যেককে তার বিনোদনের যথাযথ ব্যবস্থা করে দিন। এক্ষেত্রে একেকজনের পছন্দ নাও মিলতে পারে। সাধ্যের বাহিরে কোন কিছু হলে সেটা আক্রমণাত্মক না হয়ে বন্ধু সুলভ পরিবেশ বজায় রেখে বলার চেষ্টা করুন।
৫. স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে তার নিজের ভাল ও খারাপ লাগাগুলো বলুন। কোন শর্ত আরোপ না করে ভালবাসি বলুন। এই সময় পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
৬. বাড়ির ভেতরেই তৈরি করুন নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেরুনোর খেলা। দৌড়ানো, লাফানো বা কোনো কিছু ধরে ঝোলা-এমন সব খেলায় বাচ্চাদের সঙ্গে যেমন সুন্দর সময় কাটাতে পারবেন, সেই সঙ্গে আপনার শরীরচর্চাও হয়ে যাবে।
৭. পরিবারের সবাই মিলে বাড়ির কাছাকাছি কোনো মাঠ বা পার্কে যান। বাচ্চাদের সঙ্গে বাচ্চা বনে গিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলুন বা ঘুড়ি ওড়ান। স্রেফ দৌঁড়ালেও দেখবেন অনেকটা চাঙ্গা লাগছে।
৮. পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাজের প্রশংসা করুন। কারণ তারা একটা সময় আপনার দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব সেভাবেই চেষ্টা করেছেন আপনাকে গড়ে তুলবার। এখন আপনি তাদের পাশে থেকে পুরনো সম্পর্কটাকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসুন। বিশেষ দিনগুলোতে তাদের উপহার দিন।
৯. ছুটির দিনে সবাই মিলে সাইকেল চালান বা সাঁতার কাটুন। সাইকেল চালিয়ে নতুন নতুন জায়গায় যাওয়া কিংবা এমন গরমের সময় সবাই মিলে পানিতে কিছুক্ষণ দাপাদাপি করলে দেখবেন কতোটা ভালো লাগছে।
১০. রাতের খাবারটা সব সময় পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। সেই সঙ্গে খাবারের আয়োজনেও সবাই অংশ নিন।
১১. একসাথে পরিবার সদস্যরা কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন। তা সম্ভব না হলে মাসে একদিন বাড়িতেই পিকনিক করতে পারেন। সবাইকে সবার সাথে মিশতে দিন, কথা শেয়ার করতে দিন।
১২. বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়ে আসুন বিনোদন স্পট থেকে। শহুরে জীবনে একটু সবুজ বিরতি যেমন প্রশান্তি দেবে, তেমনি বাচ্চারা পশুপাখি, গাছপালা চিনতে শিখবে।
১৩. অভিযান কে না ভালোবাসে! নিজেরাই নিজেদের অভিযানের পরিকল্পনা করুন। বাচ্চাদের নিয়ে চলে যান নতুন কোনো নদী, বন বা পুরোনো কোনো জমিদারবাড়ি দেখতে কিংবা নতুন ধরনের কোনো খাবারের স্বাদ নিতে।
১৪. হিমালয় জয় করতে বলছি না! তবে বাচ্চাদের নিয়ে ছুটি কাটানোর জন্য যেতে পারেন এমন কোনো জায়গায় যেখানে কিছুটা হাইকিং বা পায়ে হেঁটে কোথাও পৌঁছানোর সুযোগ থাকে। এতে সবাই মিলে একটা অভিযানের স্বাদ পাওয়া যাবে এবং বাচ্চারা পরিশ্রম করতে শিখবে।

- দৈনন্দিন ছোট ছোট পদক্ষেপ ও আচরণের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করা সম্ভব। এমন কয়েকটি পদক্ষেপ বা অভ্যাস সম্পর্কে জানা যাক।
একসঙ্গে খাবার খাওয়া
প্রতিদিন অন্তত একবেলা পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সাধারণত সকাল ও দুপুরে কর্মব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে খেতে বসা সম্ভব হয় না অনেকের। সেক্ষেত্রে সন্ধ্যার নাশতা কিংবা রাতের খাবার একসঙ্গে খেতে পারেন। সবার সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে খাওয়ার সময় নির্ধারণ করুন। এমন অভ্যাস নিয়মিত হলে পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী হবে।
সবাই মিলে ঘরের কাজ
সবাই মিলে ঘরের কাজ ভাগ করে নিতে পারেন। এতে যে কোনো একজনের ওপর বেশি চাপ পড়বে না। ঘরের কাজের জন্য সহকারী থাকলেও কিছু কাজ পরিবাবের সদস্যরা করুন। বয়স অনুযায়ী ঘরের নানান কাজে আপনার শিশুকেও যুক্ত করতে পারেন। এতে সবার সঙ্গে কাজ করার গুণ ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠবে।
একসঙ্গে সময় কাটান
পরিবারের সদস্যরা মিলে একসঙ্গে সময় কাটানোর ওপর গুরুত্ব দিন। একটা নির্দিষ্ট সময়ে আড্ডা দিন, সিনেমা দেখুন কিংবা লুডো ও ক্যারমের মতো ঘরোয়া গেম খেলতে পারেন। নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় মোবাইল ফোন বা অন্যান্য গ্যাজেট দূরে রাখুন। এতে সবার শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি নিশ্চিত হবে এবং সময়টা উপভোগ্য হয়ে উঠবে।
সবাই মিলে ঘুরতে যান
সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যরা মিলে একসঙ্গে সপ্তাহের একটি দিন নির্ধারণ করুন। এদিন কাছেপিঠে কোথাও ঘুরতে কিংবা রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে পারেন। সপ্তাহে সম্ভব না হলে মাসে অন্তত একবার বাইরে খেতে ও ঘুরতে যান। এক্ষেত্রে সবার মতামতকে প্রাধান্য দিন। একসঙ্গে কাটানো এসব আনন্দময় মুহূর্ত পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করবে।
একে অপরের প্রশংসা করুন
পরিবারের সবাই একে অপরের ভালো কাজ বা গুণের প্রশংসা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শুধু ধন্যবাদ দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে ভালো দিকটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করুন। এভাবে সম্পর্কের গতিশীলতা বাড়বে। কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে পরিবারের সদস্যের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, ভেরিওয়েল ফ্যামিলি, সাইকোলজি টুডে