নোবেল জিতে ট্রাম্পকে খোঁচা দিলেন নাভি পিল্লাই
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। পুরস্কার ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তাঁর রসিকতা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও সমালোচনা এসেছে। নোবেল কমিটি ও এএফপি।
গত ৯ অক্টোবর জার্মানির নুরেমবার্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি নেতাদের বিচারের জন্য ব্যবহৃত ঐতিহাসিক আদালতকক্ষে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবরের পর বক্তব্য দেন ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই। এ সময় উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালে ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রসিকতা করেন তিনি।
পিল্লাই বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু জোরে হাততালি দেন, তাহলে আমি হয়তো এই পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’ তাঁর এ মন্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সূত্র: এএফপি।
পুরস্কার ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ইসরায়েল ওই প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। পিল্লাইয়ের নোবেল প্রাপ্তির পরও ইসরায়েলি পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
এদিকে, নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর ট্রাম্প পিল্লাইকে ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পুরস্কার না পাওয়ায় নরওয়ের সমালোচনা করেন।
পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালটিকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা জানান। তবে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাকে পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সূত্র: এএফপি ও রয়টার্স।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গন
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভানেথেম পিল্লাই। বর্ণবাদী শাসনামলে বেড়ে ওঠা পিল্লাই শৈশব থেকেই বৈষম্যের বাস্তবতা দেখেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন বাসচালক। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হন।
১৯৬৭ সালে নিজ প্রদেশ নাটালে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব আইনচর্চা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই করেন তিনি। রোবেন দ্বীপে বন্দিদের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান পিল্লাই। এরপর আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে তাঁর কর্মজীবন বিস্তৃত হয়।
রুয়ান্ডার গণহত্যা মামলায় ঐতিহাসিক ভূমিকা
রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যৌন সহিংসতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পিল্লাই। তাঁর বিচারিক অবদানের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক মামলায় ধর্ষণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তিনি সোচ্চার ভূমিকা রাখেন।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলাতেও বিচারকের দায়িত্ব
বর্তমানে পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত কার্যক্রমে অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখার জন্য পিল্লাইকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কমিটির মতে, তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় কয়েক দশকের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই পুরস্কার পিল্লাইকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।