বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরুর পর সোনার দাম প্রায় ৬০০ ডলার বেড়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষক হ্যারি ডেম্পসির মতে, সোনার দামের এই উত্থানকে ক্রিপ্টোকারেন্সির উত্থানের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
আগের পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে গত মাসে সোনার দাম আকাশ ছুঁয়েছিল। তবে এরপর দাম কিছুটা কমলেও গত সপ্তাহে প্রতি আউন্স সোনা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩০০ ডলারে। যা চলতি বছরের প্রথম দিনের দামের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দাম এখনো গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
.png)
বিশ্বের আর্থিক পরিস্থিতি এখন যেদিকে যাচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সোনাকেই বেছে নেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতি ১০০ দিনে এক লাখ কোটি (এক ট্রিলিয়ন) ডলার সরকারি ঋণ বাড়ছে। ফার্স্ট ইগল ইনভেস্টমেন্টের ম্যাক্স বেলমন্ট বলছেন, মার্কিন সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি টেকসই হচ্ছে না বলে উদ্বেগ আছে। আর সে কারণে সোনার বাজার বেশ রমরমা।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডে বিনিয়োগ করে এখন উঁচু হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে। ডলারও এই মুহূর্তের দারুণ চাঙা। ঠিক এই পরিস্থিতিতে সোনার দাম কম হওয়ার কথা। কিন্তু ঠিক উল্টোটিই ঘটছে। এর পেছনের মূলত কারণ বাজারের বড় রকমের পরিবর্তন। পশ্চিমা নয়— এমন দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। তারা বিপুল পরিমাণে সোনা কিনছে এবং এর ফলেই সোনার বাজার রীতিমতো ওলট–পালট হয়ে যাচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২৯০ টন সোনা কিনেছে। সবচেয়ে বেশি সোনা কিনেছে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ৩০ টন। এ সময়ে সোনা কেনার দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা কিনেছে ২৭ টন।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এখন সোনার মজুত প্রায় ২ হাজার ২৬২ টন। ২০২২ সালের অক্টোবরের পর থেকে তাদের সোনার মজুত বেড়েছে ১৬ শতাংশ। মার্চ মাসেও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা কিনেছে। ফলে এ নিয়ে টানা ১৭ মাস ধরে তারা সোনা কিনে চলেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন সম্পদ বা বন্ডে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। এসব দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের একটি অংশ মার্কিন বন্ডে বিনিয়োগ করে। ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ৭১ শতাংশই ছিল মার্কিন ট্রেজারি বন্ড। ২০২০ সালে এই হার কমে ৫৯ শতাংশ হয়েছে।
তবে বিশ্বে এত সোনা নেই যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার বাদ দিয়ে কেবল মূল্যবান এই ধাতুতে তাদের নিজস্ব সম্পদের মজুত রাখবে। তবে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্যের অবসানের যে কথা বলা হচ্ছে, সেই বাস্তবতা যে খুব বেশি দূরে নেই, সেটা হয়তো এখন বলা যায়।
প্রসঙ্গত, যেকোনো পণ্যের দাম ওঠানামা নির্ভর করে চাহিদা ও জোগানের ওপর। তবে সোনার ক্ষেত্রে যোগ হয় ভোক্তার আচরণ। কেউ যদি মনে করেন, সামনে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, তাহলে অর্থের ওপর ভরসা কমে যায়; কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লে অর্থের মূল্যমান হ্রাস পায়। তখন মনে করা হয়, এমন কিছু পণ্য কিনে রাখতে হবে, যার ক্ষয় নেই।
এমন নয় যে বছর বছর সোনার খনি থেকে সোনার সরবরাহ আসতেই থাকে, তাই এখানে চাহিদা-জোগানের সম্পর্কের তুলনায় ভোক্তার আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন মূল্যস্ফীতির হার উন্নত দেশগুলোতে কমতির দিকে থাকলেও নীতি সুদহার হ্রাসের সম্ভাবনা সোনার প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে।