ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ তথ্য প্রযুক্তি ]

অনলাইন গেম থেকে যৌন নিপীড়নের ফাঁদ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৮, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন গেম থেকে যৌন নিপীড়নের ফাঁদ
সংগ্রহীত ছবি

অনলাইনে কম্পিউটার গেম খেলতে গিয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল পাকিস্তানি কিশোরী জারা শাহর (ছদ্মনাম)। শুরুতে সাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা হলেও একপর্যায়ে সেই যোগাযোগ রূপ নেয় ভয়াবহ অনলাইন যৌন নিপীড়নে।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের চলতি মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে গত এক বছরে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৫ লাখ শিশু প্রযুক্তিনির্ভর যৌন নিপীড়ন ও শোষণের অন্তত একটি ঘটনার শিকার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১৬ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর মধ্যে প্রায় একজন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

Advertisement

১৭ বছর বয়সী জারা জানায়, অনলাইনে গেম খেলার সময় ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথম দিকে সে বন্ধুর মতো আচরণ করলেও কিছুদিন পর দেখা করার প্রস্তাব দেয় এবং একপর্যায়ে জারার কাছে নগ্ন ছবি চায়।

জারা বলেন, তিনি এতে রাজি না হওয়ায় ওই ব্যক্তি হুমকি দেয়—অনলাইনে তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে জারার কথোপকথনের বিষয়টি জানিয়ে দেবে। পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি কারও কাছে ঘটনাটি বলতে পারেননি।

ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ ঘটনার নিপীড়কই ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ। অর্থাৎ অনলাইন নিপীড়নের বড় অংশ অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটে—এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

ইউনিসেফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড্যানিয়েল কারডেফেল্ট এএফপিকে বলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা, অনলাইন গেমে আলাপ, উপহার বা অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রেমের সম্পর্কের প্রস্তাবের মাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতে পারে নিপীড়কেরা। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

পাকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এমন নিপীড়নের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজিটাল পরিবেশ। ইউনিসেফের গবেষণায় ৪৪ শতাংশ রিপোর্ট করা ঘটনার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ ধরনের ঘটনায় হোয়াটসঅ্যাপ ও স্ন্যাপচ্যাটের ব্যবহারও উল্লেখ করা হয়েছে।

লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা পহচানের পরিচালক মেহেক নাঈম জানান, অপরাধীরা অনেক সময় ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো পরিবার বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আরও ছবি-ভিডিও, অর্থ কিংবা শারীরিক সম্পর্কের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

জারার ক্ষেত্রেও পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ করার হুমকি তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। তার আশঙ্কা ছিল, পরিবার জানতে পারলে স্কুলে যাওয়া কিংবা বাড়ির বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে থেকেও তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন।

ইউনিসেফের হিসাবে, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের প্রবেশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে প্রযুক্তিনির্ভর যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া অর্ধেকের বেশি শিশু কাউকে বিষয়টি জানায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীর মতো আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে অভিযোগ করার কথা জানায়নি। সামাজিক লজ্জা, পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়ার ভয় এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপের আশঙ্কা তাদের নীরব থাকার অন্যতম কারণ।

এদিকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানে নীতিগত আলোচনাও চলছে। চলতি মাসে পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। তবে ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নযোগ্যতা ও শিশুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী সালমান আফ্রিদি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের প্রলুব্ধ করা, ব্ল্যাকমেইল, যৌন কনটেন্ট তৈরি ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক চক্র তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেও এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইউনিসেফের গবেষণায় পাকিস্তানে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, যৌন চাঁদাবাজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া যৌন ছবি বা ভিডিও তৈরির মতো নতুন ঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে। সংস্থাটি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

অনলাইন গেম দিয়ে শুরু হওয়া সেই যোগাযোগের পরও আতঙ্ক কাটেনি জারার। এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে সে জানায়, ঘটনার পর থেকে সে ভয় নিয়েই বেঁচে আছে।

সূত্র: এএফপি

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!