ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় আস্থার নাম চীনের গুয়াংঝৌ হাসপাতাল

বায়েজীদ মুন্সী, চীন থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১৭:৪৭, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় আস্থার নাম চীনের গুয়াংঝৌ হাসপাতাল
চীনের গোয়াংঝৌতে নানশা ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন বাংলাদেশী এক রোগী

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে ১২৭ বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে চিকিৎসাসেবায় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে চীনের গুয়াংডং প্রদেশের স্বনামধন্য চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ‘গোয়াংঝৌ ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল’। ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন এই চিকিৎসাপীঠটি দীর্ঘ পরিক্রমায় উন্নত চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসা গবেষণা এবং দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। 

চীনের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্রেড-৩ ক্লাস-এ’ পর্যায়ের হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃত এই প্রতিষ্ঠানটি গুয়াংঝৌ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্রথম অধিভুক্ত হাসপাতাল এবং সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দ্বিতীয় অধিভুক্ত হাসপাতাল। জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলোর তালিকায় ধারাবাহিক অবস্থানের পাশাপাশি ২০২৪ সালে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে হাসপাতালটি।

বর্তমানে তিনটি সুসজ্জিত ক্যাম্পাসে বিস্তৃত গোয়াংঝৌ ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯৭০টি। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ও স্থানীয় অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ রোগী এখান থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। বিশাল এই চিকিৎসাব্যবস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি দক্ষ দল।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞ দলে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য স্টেট কাউন্সিলের বিশেষ সরকারি ভাতাপ্রাপ্ত ১০ জন চিকিৎসক এবং এক হাজারের বেশি জ্যেষ্ঠ পেশাজীবী যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব মেডিসিনের সদস্যসহ অন্তত ৮৩ জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আমন্ত্রিত গবেষক ও পণ্ডিতের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জাতীয় পর্যায়ের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বিভাগ হলো—হেমাটোলজি (রক্তরোগ), গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, জেরিয়াট্রিক্স ও ইউরোলজি। এছাড়া রয়েছে ২১টি প্রাদেশিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বিভাগ। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষণাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত পাঁচ বছরে চীনের ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে ১৫৯টি গবেষণা অনুদান পেয়েছে এটি।

বিদেশি রোগীদের সুবিধার্থে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে তিনটি সহজ ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, দেশ থেকেই রোগীর মেডিকেল রিপোর্ট পর্যালোচনা, প্রাথমিক স্ক্রিনিং, বিশেষজ্ঞের মতামত প্রদান এবং ভিসা সহায়তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে চিকিৎসাকালীন নির্দিষ্ট চিকিৎসক নির্বাচন, ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং সার্বক্ষণিক দোভাষী ও সমন্বয়ক সেবা প্রদান করা হয়। এবং তৃতীয়ত, চিকিৎসা-পরবর্তী সময়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পর নিয়মিত ডিজিটাল ফলোআপ, স্বাস্থ্য পরিস্থিতির পুনর্মূল্যায়ন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালটির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো হেমাটোলজি বা রক্তরোগ বিভাগ। অধ্যাপক ফু ইয়ংশুই এবং অধ্যাপক ওয়াং শুনচিং-এর মতো প্রখ্যাত গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এই বিভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, অ্যাকিউট লিউকেমিয়া, জুভেনাইল মায়েলোমোনোসাইটিক লিউকেমিয়া, মাল্টিপল মায়লোমা এবং লিম্ফোমার মতো জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় বিভাগটি বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। হাসপাতালে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগটিতে প্রতিবছর প্রায় ১০০টি হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

এক গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় রোগীদের বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। অ্যাকিউট লিউকেমিয়ার মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের রোগমুক্ত থাকার হার ৭০ শতাংশের বেশি। শিশুদের বিরল রক্তরোগ জেইউএমএমএল-এর ক্ষেত্রেও পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশের বেশি। এ পর্যন্ত বিভাগটিতে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি সফল স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি মাল্টিপল মায়লোমার চিকিৎসায় আধুনিক সিএআর-টি সেল থেরাপি এবং লিম্ফোমা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ‘এমআইসিএম’ প্রযুক্তির ব্যবহার রোগীদের নতুন আশা দেখাচ্ছে।

হাসপাতালটিতে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা হাসান মাহমুদ বলেন, ভিসা সহায়তার চিঠি থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর হাসপাতালে যাতায়াত—সবকিছুই খুব গোছানো ছিল। সেখানকার চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ভিন্ন দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ কোনো বাধাই মনে হয়নি।

বিদেশি রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে হাসপাতালটিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিশেষায়িত ‘ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টার’। বিশেষ করে বৃহত্তর বে এরিয়া অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হংকং ও ম্যাকাওয়ের ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিশেষ প্রবেশাধিকার কর্মসূচির সুবিধা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রযুক্তি ও আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে এখানে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিদেশি রোগীদের আগমন ও চিকিৎসা নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে চালু রাখা হয়েছে বহুভাষিক অনুবাদক, বিমানবন্দর থেকে হাসপাতালে যাতায়াত ব্যবস্থা, ভিসা প্রক্রিয়ায় অফিসিয়াল সহায়তা এবং ব্যক্তিগত রোগী সমন্বয়ক। এছাড়া এইচএসবিসি লাইফ, বিউপা, এসা, এআইএ, চায়না পিং অ্যান এবং চায়না তাইপিং-এর মতো বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বিল পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। 

চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী জানান, বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বীমা দাবি ও ভাষার জটিলতা একটি বড় চিন্তা থাকে। কিন্তু গোয়াংঝৌ ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের পার্সোনাল কোঅর্ডিনেটর এবং সরাসরি বিল পরিশোধ সুবিধার কারণে কোনো ঝামেলা ছাড়াই চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পেরেছি। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্যিই প্রশংসনীয়।

এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক চেংজ্যুয়ান চাং বলেন, বিদেশে চিকিৎসা নিতে আসা একজন রোগীর জন্য শুধু উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; ভাষা, যাতায়াত, ভিসা, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ—প্রতিটি বিষয়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা রোগীদের পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে সমন্বিত সেবা চালু করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক রোগীরা যেন নিজেদের পরিচিত পরিবেশের মতোই আস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চিকিৎসা নিতে পারেন।

গুয়াংঝৌর নানশা ফার্স্ট পিপলস হসপিটালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ঔয়াং ইংজুন বলেন, ১২৭ বছরের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বড় অর্জন ও একই সাথে দায়িত্বের বিষয়। আমরা ঐতিহ্যকে ধারণ করার পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে রোগীদের সর্বোচ্চ মানের সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য শুধু রোগের চিকিৎসা নয়, প্রতিটি রোগীর জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নানশা ক্যাম্পাসের আধুনিক ব্যবস্থাপনা গোয়াংঝৌ ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালকে আজ বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা পর্যটকদের বিশ্বস্ত ঠিকানায় পরিণত করেছে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার চমৎকার মেলবন্ধনে প্রতিষ্ঠানটি আগামী দিনেও বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!