ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

দিনে কত কাপ কফি নিরাপদ?  যা বলছে বিজ্ঞান

রাইসা মেহজাবীন
প্রকাশিত: ০৯:৫৯, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দিনে কত কাপ কফি নিরাপদ?  যা বলছে বিজ্ঞান
কফি উপভোগ করুন, তবে সচেতনভাবে। কারণ সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি শুধু কী খাচ্ছেন, তা নয় কতটুকু এবং কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ

কফি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। কর্মব্যস্ত সকাল, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কিংবা আড্ডার মুহূর্ত এক কাপ কফি যেন অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। তবে কফি নিয়ে একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে প্রতিদিন কতটুকু কফি পান করা নিরাপদ? 

কফিকে সম্পূর্ণ ক্ষতিকর খাবার হিসেবে দেখারও কারণ নেই। এফডিএ-এর মতে, অধিকাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে ক্যাফেইন থাকতে পারে। মূল বিষয় হলো পরিমাণ এবং ব্যক্তিগত সহনশীলতা।

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, এর উত্তর সবার জন্য এক নয়; বরং এটি নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণ সাধারণত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়, যা কফির ধরন ও প্রস্তুতপ্রণালীর ওপর নির্ভর করে প্রায় ৪ থেকে ৫ কাপ ব্রু করা কফির সমতুল্য হতে পারে। 

সুস্থ অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে ২-৩ কাপ সাধারণ কফি সাধারণত নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকতে পারে, তবে কফির আকার ও ক্যাফেইনের ঘনত্ব বিবেচনা করতে হবে। শরীরে অস্বস্তির লক্ষণ দেখা দিলে পরিমাণ কমানোই ভালো।

বর্তমান গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিমাণ ক্যাফেইন গ্রহণ হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এমন কোনো শক্তিশালী প্রমাণ নেই।

তবে কফি পানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট সবার শরীর একইভাবে ক্যাফেইনের প্রতি সাড়া দেয় না। কারও ক্ষেত্রে এক কাপ কফিই অনিদ্রা, অস্থিরতা, হৃদ্‌কম্পন বা উদ্বেগের কারণ হতে পারে, আবার কেউ তুলনামূলক বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করেও তেমন কোনো সমস্যা অনুভব করেন না। তাই কেবল নির্ধারিত সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

  • কফির স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও কম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চিনি, ক্রিম বা উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত ফ্লেভার ছাড়া ব্ল্যাক কফি পান করলে টাইপ–২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, হৃদ্‌অকার্যকারিতা (হার্ট ফেইলিউর) এবং কিছু ধরনের অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দনের ঝুঁকি কমতে পারে। 

গবেষণায় নিয়মিত কালো কফি পান করার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে দুধ, চিনি, স্বাদ বাড়ানোর উপকরণ বা মিষ্টি সিরাপ যোগ করলে সেই উপকার কমে যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন দুই থেকে চার কাপ কফি পানকারীদের মধ্যে হৃদরোগ, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে চার কাপের বেশি কফি পান করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

তবে এই উপকারিতা মূলত চিনি ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত উপাদানবিহীন কফির ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ, হুইপড ক্রিম বা উচ্চ-চর্বিযুক্ত উপাদান যোগ করলে কফির সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেকটাই কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে সব ধরনের কফির প্রভাবও এক নয়। এসপ্রেসো, ফ্রেঞ্চ প্রেস, তুর্কিশ কফি এবং সেদ্ধ কফির মতো আনফিল্টারড কফিতে ক্যাফেস্টল (Cafestol) নামক একটি প্রাকৃতিক যৌগ থাকে, যা রক্তে LDL বা "খারাপ" কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। 

বিপরীতে, পেপার-ফিল্টারড কফি এবং ইনস্ট্যান্ট কফিতে এই যৌগ কার্যত থাকে না। তাই যাদের কোলেস্টেরল বেশি বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য ফিল্টার করা কফি তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে।

এছাড়া এনার্জি ড্রিংকের বিষয়টিও আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি। এসব পানীয়তে প্রায়ই অত্যধিক ক্যাফেইনের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার চিনি ও অন্যান্য উত্তেজক উপাদান থাকে, যা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কফি ও এনার্জি ড্রিংককে এক কাতারে ফেলা উচিত নয়।

  • সবশেষে বলা যায়, কফি নিজে শত্রু নয়; বরং এর পরিমাণ, ধরন এবং পান করার অভ্যাসই স্বাস্থ্যগত প্রভাব নির্ধারণ করে। পরিমিত মাত্রায়, বিশেষ করে চিনি ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত উপাদান ছাড়া কফি পান অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিরাপদ এবং উপকারী হতে পারে। 

তবে গর্ভবতী নারী, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন বা ক্যাফেইনের প্রতি অতিসংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ অনুযায়ী কফি গ্রহণ করা উচিত।

কফি উপভোগ করুন, তবে সচেতনভাবে। কারণ সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি শুধু কী খাচ্ছেন, তা নয় কতটুকু এবং কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ 
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!