ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

ঢাকা গেট‌: ৩৬৩ বছরের অবিচ্ছেদ্য ইতিহা‌স

মোহাম্মদ রুবেল
প্রকাশিত: ২১:৩৮, ২৪ জানুয়ারি ২০২৪
ঢাকা গেট‌: ৩৬৩ বছরের অবিচ্ছেদ্য ইতিহা‌স
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকার ৩৬৩ বছরের ইতিহা‌সের অবিচ্ছেদ্য অংশ মীর জুমলা গেট। বর্তমানে যা ঢাকা গেট নামে পরিচিত। দীর্ঘ কয়েক যুগ পর নান্দ‌নিকতার ছোঁয়ায় পুরনো জৌলুস ফি‌রে পে‌য়ে‌ছে মুঘল আমলের নান্দনিক এ স্থাপত্য। সচেতন নাগরিকদের দীর্ঘদিনের দাবির পর সংস্কার শেষে বুধবার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ঢাকা গেট‌।

জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) প্রবেশপথে নির্মিত ঢাকা গেট অনেকের কা‌ছে ময়মন‌সিংহ ও রমনা গেট না‌মেও প‌রি‌চিত।

ইন্টারনেটে মীর জুমলা গে‌ট খুঁজ‌তে গি‌য়ে পাওয়া ‌যায় পুর‌নো এক‌টি ছ‌বি। সেই ছবিতে দেখা গেছে, মীর জুমলা গেটের সামনে একদল হাতি, পেছনে সবুজ গাছপালা ও মন্দিরের একটি চূড়া। ২০২৪ সালের এ সময়ে এসে ঢাকা গেট খুঁজে পেতে চাইলে যেতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএস‌সি চত্বর ও বাংলা একাডেমি পে‌রি‌য়ে তিন নেতার মাজারের কাছে। ‌সেখা‌নে দেখ‌া মিলবে হলুদ রঙের মীর জুমলার তোরণ। ত‌বে সেকালের সঙ্গে একা‌লের ঢাকা গেটের ছবি মেলাতে গেলেই ধাক্কা খেতে হবে। এখন আর‌ সেই হাতির দল নেই। আশপাশের নকশায়ও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।

Advertisement

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) হস্তক্ষেপে নতুন রূ‌প ফি‌রে পে‌য়ে‌ছে ঐতিহাসিক এ মুঘল স্থাপনা। ঢাকা শহ‌রে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াস হিসেবে ৩৬৩ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকা গেট‌কে সপ্তদশ শতকের রূপে ফিরিয়ে আন‌তে ২০২৩ সালের মে মাসে সংস্কার কা‌জ শুরু ক‌রে ডিএসসিসি, যা শেষ হয় সম্প্রতি।

সরেজ‌মি‌ন দেখা গেছে, নতুন নকশার আদ‌লে নি‌র্মিত হয়েছে ঢাকা গে‌ট। ওসমানী উদ্যান থে‌কে আনা মীর জ‌মুলার কামানও গেটের নতুন নকশায় সংযোজন করা হয়েছে। গেট‌টি নির্মা‌ণ ও নান্দনিক করতে ব‌্যবহৃত হ‌য়ে‌ছে ইট, সুড়কি, কেমিক্যাল ও সুপারির রস। ভেত‌রে গে‌টের চার‌দি‌কে রয়েছে দর্শনার্থীদের বসার স্থান।

ঐতিহ‌্য‌বা‌হী মীর জুমলা গেটের তিনটি অংশ। একটি নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের দিকে, মাঝের অংশ পড়েছে মে‌ট্রেরেল স্টেশনের নি‌চে এবং অপর অংশটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে তিন নেতার মাজারের পা‌শে। 

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার সুবাদার ছিলেন মীর জুমলা। তি‌নি বাংলার সুবেদার (মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক) ছি‌লেন। তি‌নি ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করতে এবং স্থলপথে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষায় খুব প্রশস্তভাবে মীর জুমলা গেট নির্মাণ ক‌রে‌ছি‌লেন। কয়েক শতাব্দী ধরে এই গেট রূপান্তর করা হয়।

ঢাকা গেট‌: ৩৬৩ বছরের অবিচ্ছেদ্য ইতিহা‌স

১৮২৫ সালে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডাউস এটি পুনর্নির্মাণ করার পর এর নাম দেন ‘রমনা গেট’। ব্রিটিশ শাসনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসন চলাকালীন সময়ে গেটটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি ঐতিহাসিক মুঘল স্থাপনা। এটি আবার কারো কা‌ছে ময়মনসিংহ গেট নামেও পরিচিত। ত‌বে বর্তমা‌নে সর্বা‌ধিক প‌রি‌চিত ঢাকা গেট না‌মে।

দেশের প্রখ্যাত স্থপতি ও স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আবু সাঈদের নেতৃত্বে একদল বিশেষজ্ঞ গেটটির নতুন নকশা তৈরি করেন। সেই নকশার আদলেই সংস্কার হয়ে‌ছে ঢাকা গেট।

অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ ডেইলি বাংলা‌দেশ‌কে ব‌লেন, ঢাকা গেট সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হলো এর গুরত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো। ১৯৬০-এর দশকের অংশগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ওসমানী উদ্যান থে‌কে আনা মীর জুমলা কামান গেটের নতুন নকশায় সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমা‌নে এই গেটের তিনটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু শুরুতে এমনটি ছিল না। শুরুতে সড়কটি এক লেনের হওয়ায় গেটের দুটি অংশ ছিল। ষাটের দশকে সড়কটি যখন দুই লেন করা হয়, তখন গেটের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। তিন নেতার মাজারের অংশটি নতুন করে তৈরি করা হয়। বর্তমা‌নে দুই রাস্তার মাঝের পিলারটি সেই ভাঙা অংশেরই একটি।

তিনি আরো বলেন, পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় গেটটি সেই সম‌য়কার মূল উপকরণ চুন-সুড়কির প্লাস্টার দিয়েই আমরা এটি সংস্কার করে‌ছি। এ স্থাপনায় ৬টি পিলার রয়েছে, যার মধ্যে একটি পিলার বাদে বাকিগুলো প্লাস্টার করা হ‌য়ে‌ছে। যাতে মানুষ আসল ইটগুলো দেখতে পারে এবং বুঝতে পারে যে মুঘল আমলে গেটটা দেখতে কেমন ছিল। 

ঢাকা দ‌ক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূ‌ত্রে জ‌ানা গেছে, ঢাকা শহরকে পর্যটকবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে নেয়া নানা উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক ‘মীর জুমলা গেট’ বা ‘ঢাকা গেট’কে সপ্তদশ শতকের রূপে ফিরিয়ে আন‌তে সংস্কার ক‌রা হ‌য়ে‌ছে। এতে ৮২ লাখ টাকা ব‌্যয় হ‌য়ে‌ছে। আগে ৩ ইঞ্চি বাই ১০ ইঞ্চি সাইজের ইট দিয়ে গেটটি সংস্কার করা হয়েছিল। মুঘল আমলে গেটটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল দেড় ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি সাইজের ইট। এ স্থাপনায় ৬টি পিলার রয়েছে।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ডেইলি বাংলা‌দেশ‌কে বলেন, ১৮৩০ সালের দিকে এটি রমনা গেট হিসেবে তৈরি করা হয়। যা বর্তমা‌নে ঢাকা গেট হি‌সে‌বে প‌রি‌চিত। এই গেট ঢাকা শহ‌রের শত বছ‌রের সংস্কৃ‌তি।

তি‌নি আরো ব‌লেন, ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে ঢাকা গেটের মতো আরো পদক্ষেপ নি‌তে হ‌বে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!