পুরো অনুষ্ঠানে তিনি বেশ কয়েকবার দীপ্তির ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন এবং উচ্চবাচ্য করেন। স্টুডিও ছাড়ার আগেও তিনি দীপ্তিকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। সেসময় দীপ্তি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বলে দাবি করেন। সেই ঘটনায় টক-শো সেটে ধারণকৃত একটি ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে মানিকের ঐ আচরণ এবং দীপ্তির দাবি নিয়ে ইন্টারনেটে নানান তর্ক-বিতর্ক চলে, প্রচারিত হয় বিভিন্ন তথ্য।
এরই ধারাবাহিকতায়, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য প্রসঙ্গে দীপ্তি চৌধুরী’ আমার নানীর ফুফাতো বোনের স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন’ শীর্ষক শিরোনামে জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ডিজাইন সম্বলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত হয়েছে৷
.png)

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য প্রসঙ্গে দীপ্তি চৌধুরী’ আমার নানীর ফুফাতো বোনের স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন’ শীর্ষক শিরোনামে দ্য ডেইলি স্টার কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি বরং, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় দ্য ডেইলি স্টারের প্রচলিত ফটোকার্ডের আদলে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এতে দ্য ডেইলি স্টারের লোগো দেখতে পাওয়া যায়। তবে, আলোচিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে দ্য ডেইলি স্টারের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

পরবর্তীতে, গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ যাচাই করে এ সংক্রান্ত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রাসঙ্গিক কী-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দ্য ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
দীপ্তি চৌধুরীর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল যাচাই করে আলোচিত বক্তব্যের বিষয়ে কোনো পোস্ট বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, দীপ্তি চৌধুরীর বক্তব্য দাবি করে দ্য ডেইলি স্টার এর নামে প্রচারিত এই ফটোকার্ডটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট।
মুক্তিযুদ্ধে দীপ্তি চৌধুরীর পরিবারের তৎকালীণ সদস্যদের ভূমিকা
দীপ্তি চৌধুরী বলেছেন তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের’ সন্তান। এরমানে, তার পরিবারের কেউ না কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাই তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান।
আবারো মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে- টু দ্য পয়েন্ট টক শো-তে যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলো (https://www.youtube.com/watch?v=h6YXLnyG7-A ।) সেখানে দীপ্তি চৌধুরী কোথাও বলেননি তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেছেন- আমি ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের’ সন্তান।
ঘটনার কিছুদিন পরেই দ্য আরজে কিবরিয়া শো তে গিয়ে দীপ্তি চৌধুরী বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছিলেন, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তিনি বলেছিলেন, তার দাদা এবং সেই প্রজন্মের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটির (13.1- 14.17) অংশে এই বক্তব্য পাওয়া যাবে-
https://youtu.be/VZMBbD3ppR8?si=hitS18ewTsp1tJYl
জানা গেছে, দীপ্তি চৌধুরীর জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায়। তবে তার দাদার বাড়ি ও বাবার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম থানার আদমপুর ইউনিয়নে। তার দাদা নুরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন আদমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। (মুক্তিযুদ্ধের কিছু কাগজপত্রে তাকে নুর ইছলাম চৌধুরি হিসেবে লেখা হয়েছে, তার বাবার নাম আবদুল হামিদ চৌধুরী)। ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে তার অস্ত্র জমা দেওয়ার দলিলটি এখানে দেওয়া হলো।

অষ্টগ্রামের স্থানীয় মানুষ এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে দীপ্তি চৌধুরীর দাদা মরহুম নুরুল ইসলাম চৌধুরী সম্পর্কে জানা যায়। দেশাত্মবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে বিষয়ক নিজস্ব ধারণা থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো সুবিধা গ্রহণ করেননি এবং সার্টিফিকেটও গ্রহণ করেননি (যা স্থানীয় চেয়ারম্যান তার স্মৃতিচারণে নিশ্চিত করেছেন)। এ বিষয়ে একটি ভিডিও ডকুমেন্ট এখানে পাওয়া যাবে-
https://youtu.be/UvSLzwoOLPo
যৌথ পরিবারে দীপ্তি চৌধুরীর দাদারা ১৪ ভাই (আপন+চাচাতো) ছিলেন। এদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন ৪ জন। আরেকজন বর্ডার ক্রস করে ট্রেনিং এ গেলে বয়স কম থাকায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দীপ্তি চৌধুরীর চাচাতো দাদা জয়নুল আবেদীন চৌধুরী (যার পিতা আবদুল হামিদ চৌধুরী) বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বর্ডার পেরিয়ে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে তিনি ওয়ারলেস অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ.জি ওসমানির কাছ থেকে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত।

অষ্টগ্রামে দীপ্তি চৌধুরীর দাদা মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও তার ভাইদের গৌরবময় ভূমিকা সুবিদিত। নুরুল ইসলাম চৌধুরীর মুক্তিযোদ্ধা চাচাতো ভাইয়েরা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সনদ নিয়েছেন। তারাও দিপ্তী চৌধুরীর দাদা হন। 

উপরের সকল প্রমাণ সাপেক্ষ নিঃসন্দেহে বলা যায়- দীপ্তি চৌধুরী সম্মানীত মুক্তিযোদ্ধার নাতনি। তার পিতা শিবলী চৌধুরীর বেড়ে ওঠা কর্মসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বাস করলেও, তার বর্ধিত পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ অষ্টগ্রামে এখনো বাস করছেন।