রিপোর্ট দেখাতে গিয়ে স্বজনকে পেটানোর অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে
জয়পুরহাটের ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অসুস্থ ভাতিজীর চিকিৎসার জন্য গিয়ে রিপোর্ট দেখানোর সময় এক স্বজনকে চিকিৎসক ও তাঁর সহযোগীরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার (৪ অক্টোবর) হাসপাতালের বহির্বিভাগে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন মো. হাদুয়াল মামুন।
এ ঘটনায় হাসপাতালের কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. এস. এম. মুনিম রমিম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হাদুয়াল। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
হাদুয়াল মামুন জয়পুরহাট সদর উপজেলার সবুজনগর এলাকার বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার সময় ১৭ বছর বয়সী অসুস্থ ভাতিজী সাদিয়া আফরিন শিফা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। মারধরের ঘটনায় তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে এবং দুই হাতে আঘাতের কারণে রক্তপাত হয়। এ সময় আতঙ্কে তাঁর ভাতিজী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগপত্র ও হাদুয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর অসুস্থ ভাতিজীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে যান তিনি। বহির্বিভাগের ২৩৫ নম্বর কক্ষে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. মুনিম রমিম রোগীকে দেখে কয়েকটি পরীক্ষা দেন। পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে ৪ অক্টোবর আবার হাসপাতালে আসতে বলেন তিনি।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোববার রিপোর্ট নিয়ে হাসপাতালে যান হাদুয়াল ও তাঁর ভাতিজী। তাঁর অভিযোগ, সে সময় চিকিৎসক কক্ষে ছিলেন না। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর চিকিৎসক এলে রিপোর্ট দেখানোর অনুরোধ করেন তিনি। এ সময় চিকিৎসক তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করেন হাদুয়াল।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ভাতিজীকে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান তিনি। পরে বিষয়টি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও)-কে জানানোর চেষ্টা করেন বলে দাবি করেন হাদুয়াল।
হাদুয়ালের অভিযোগ, দুপুরের দিকে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসক ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরও তিন ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের গেটের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়।
হাদুয়াল বলেন, ‘মারধরের একপর্যায়ে তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও বাম হাতের কনুইয়ের নিচে আঘাত লেগে রক্তপাত হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত লাগে। এ সময় আতঙ্কে তাঁর অসুস্থ ভাতিজী ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে স্থানীয় পরিচিত মজনু, আব্দুর রহিম ও গোলজারসহ কয়েকজন এগিয়ে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন।’
ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোনো রকমে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান বলে জানান হাদুয়াল। ওই দিন রাত ৯টার পর আবার জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তাঁর দাবি, কর্তব্যরত চিকিৎসক চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজে ঘটনাটি ‘পুলিশ কেস’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
হাদুয়াল মামুন বলেন, ‘হাসপাতালের মতো জায়গায় সরকারি চিকিৎসাসেবা নিতে এসে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হব, কখনো ভাবিনি। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। আমি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. এস. এম. মুনিম রমিম বলেন, ‘উনি আমাদের অফিস সময়ের পরে এসেছিলেন। এজন্য তাঁকে পরের দিন আসার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি তখন আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন এবং যাওয়ার সময়ও খারাপ কথা ও গালিগালাজ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গালিগালাজের পরিমাণটা বেশি ছিল। তাঁকে নিয়ে আমরা অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। যাওয়ার পথে একটু টর্চার করছিলাম, এইটুকুই।’
ওই ব্যক্তির আচরণের জন্য আগে বিচার হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘উনি একজনের রুমে এসে গালিগালাজ করে চলে যাবেন, এটা অন্যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসলে বিষয়টি ভিন্ন ছিল। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেটা করতে চেয়েছেন।’
এ বিষয়ে জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. মামুন বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যতটুকু জানার চেষ্টা করেছি, বিষয়টি তদন্ত করে আমাকে জানাতে বলা হয়েছে। তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।’
অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘রমিমকে অনেক আগে থেকেই চিনি। সে ভদ্র ছেলে, ভালো ছেলে। এমন ঘটনা হওয়ার কথা নয়। তারপরও অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য তত্ত্বাবধায়ককে বলা হয়েছে।’