ভৈরবে আবারও ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু, সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে ভর্তি ২২৬ জন
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আবারও ডেঙ্গু আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে লায়লা মাহাবুবা মিতা (৪৮) নামে ওই নারী মারা যান। তিনি পৌর শহরের ভৈরবপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার বিল্লাল মিয়ার মেয়ে। এ নিয়ে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ জন শিশু, ৯ জন নারী ও ১৩ জন পুরুষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩৬০ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। আর সেপ্টেম্বর মাসেই ভর্তি হয়েছেন ২২৬ জন।
.png)
ভৈরবের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকছেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও শতাধিক রোগী। ফলে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভৈরবপুর দক্ষিণপাড়া এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকা এবং মশক নিধন কার্যক্রম যথেষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। আমার আত্মীয় লায়লা মাহাবুবা মিতাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। আমরা নিজেদের মতো করে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ময়লার স্তূপের পাশাপাশি দুটি বড় ময়লার ভাগাড় রয়েছে। এসব জায়গা দ্রুত পরিষ্কার করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ময়লা অপসারণের দাবিতে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ভৈরবের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ভৈরব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি জাহিদুল হক জাবেদ বলেন, ভৈরবে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চেম্বারের পক্ষ থেকে এবং উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ছোট-বড় অনেক ময়লার স্তূপ রয়েছে। পাশাপাশি দুটি বড় ময়লার ভাগাড়ও আছে। ময়লা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান না হলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি এক ডেঙ্গু রোগীর স্বামী জসিম উদ্দিন বলেন, চার-পাঁচ দিন ধরে জ্বর থাকার পর স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। আজ তিন দিন ধরে চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক। সিট না থাকায় মেঝেতেও রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আরেক রোগীর বাবা হাজিফ মিয়া বলেন, কয়েক দিন আগে আমার ছেলের জ্বর অনেক বেড়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করার পর পরীক্ষা করে জানতে পারি, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তার প্লাটিলেটও কমে গিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে এখন কিছুটা সুস্থ আছে। আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. কিশোর কুমার ধর বলেন, তাঁর স্ত্রীও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু একজন ব্যক্তি সচেতন হলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে।
ডা. কিশোর কুমার ধর জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ভৈরবের ইসরাত জাহান স্পেশালাইজড হাসপাতালে বর্তমানে ৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসক ফরহাদ আহমেদ বলেন, “ডেঙ্গু মোকাবিলায় মানুষের সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পর্যাপ্ত তরল খাবার খেতে হবে। বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে দ্রুত তা অপসারণ করতে হবে।”
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে. এম. মামুনুর রশীদ বলেন, ভৈরবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌরসভার পক্ষ থেকে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও মশক নিধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ময়লা ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণসহ বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত ময়লা অপসারণ এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসা ও পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোরও দাবি রয়েছে।