পাঁচ দশক গাছ রোপণ করছেন ইকবাল খান
গাছের সঙ্গে সম্পর্ক যেন ছাত্র জীবন থেকেই। নিজের জীবনের পাঁচ দশক পার করে দিয়েছেন বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে। পেশা জীবনে ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। কিন্তু চাকরির ব্যস্ততার মাঝেও গাছ লাগানোর অভ্যাস ছাড়েননি। এখন অবসরে চলে আসায় গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বৃক্ষরোপণ করে চলেছেন ইকবাল আহাম্মদ খান নামে এক সাবেক কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা। ইকবাল আহাম্মদ খান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের দেবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা।
তিনি বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ, মসজিদ-মাদরাসা মাঠ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খোলা জায়গায় জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, হিজল, নিম, কাঁঠালসহ নানা জাতের ফলদ ও বনজ গাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন। তবে বয়স বাড়লেও গাছ লাগানোর প্রতি এখনো তার আগ্রহ কমেনি। গাছ লাগানো যেন নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পযর্ন্ত তিনি প্রায় ৬ হাজার গাছ রোপন করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি এলাকায় বৃক্ষপ্রেমী হিসাবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। তার নিজের হাতে লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়ে ছায়া দিচ্ছে, ফুল-ফল দিচ্ছে, পাখিদের আশ্রয় হয়ে উঠেছে। এসব গাছের দিকে তাকালেই যেন নিজের দীর্ঘ জীবনের একটি অংশ খুঁজে পান তিনি।
স্থানীয় লোজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইকবাল আহাম্মদ খান দীর্ঘ বছর ধরে নীরবে এই কাজ করে আসছেন। তার লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়েছে। পথচারীরা এসব গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। বিভিন্ন স্থানে লাগানো ওইসব গাছগুলো এখন এলাকার সৌন্দর্যও বাড়িয়েছে।
ইকবাল আহাম্মদ খান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমি তখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময় এক পীরের মাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কামিনী ফুলের গন্ধে আমি মুগ্ধ হয়ে যায়। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি কামিনি গাছের চারা সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে রোপণ করি। তখন থেকেই শখ হয় গাছ লাগানোর।
তিনি বলেন কলেজে পড়ার সময় বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রায় ১০০টি কাঁঠাল গাছের চারা ক্রয় করি। এরপর বাড়ির চারপাশে ওইসব চারা রোপন করি। প্রায় সাত বছরের মাথায় গাছে ফলন আসতে শুরু করে। নিজে খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনদের মাঝেও বিলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে গাছ লাগাতে শুরু করি।
তিনি বলেন পড়ালেখা শেষ করার পর কৃষি ব্যাংকে আমার চাকুরি হয়। দীর্ঘ বছর আখাউড়ায় দায়িত্ব পালন করি। তাছাড়া চাকরির সুবাদে আমাকে কসবা, সরাইল ও বিজয়নগরসহ বেশ অনেক জায়গাতে যেতে হয়েছে। ওইসব জায়গাতেও গাছের চারা লাগানো হয়। ছুটি পেলে যখন বাড়িতে আসা হতো সুযোগ করে গাছের চারা লাগানো হয়েছে। চাকরি জীবন শেষে এখন অবসর জীবনযাপন করছি। তবে অবসর নিলেও গাছ লাগানোর নেশা ঠিকই রয়েছে । এখনও মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করছি।
ইকবাল আহাম্মদ খান মনে করেন, গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাই করে না, মানুষের জীবনকেও সুন্দর করে। একটি গাছ লাগানোর অর্থ হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়া। গাছ লাগানো আমার কাছে এখন শুধু শখ নয়, এটা এক ধরনের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের লাগানো গাছ যখন বড় হয়, তখন যে আনন্দ পাই, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি গাছ হয়তো আজ ছোট, কিন্তু কয়েক বছর পর সেটিই অনেক মানুষের উপকারে আসবে।
তিনি আরও বলেন, গাছপালা তাপমাত্রা কমায়। গাছ লাগালে এলাকা সুন্দর হয়, ফুল দেখলে মানুষের মন ভালো হয়ে যায়। গাছ লাগিয়ে আমি মানসিক শান্তি ও আনন্দ পাই। সমাজের জন্য যদি কিছু করতে পারি, মানুষকে একটু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দিতে পারি এটাই আমার স্বার্থকতা।
পরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও নানা ধরনের দূষণের কথা উল্লেখ করে ইকবাল আহাম্মদ খান বলেন, এসব মোকাবিলায় গাছের বিকল্প নেই। শুধু সরকারি উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রত্যেক মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে গাছ লাগাতে হবে। একমাত্র গাছই পারে পরিবেশকে বাঁচাতে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ বাঁচানোও জরুরি। আমরা যদি প্রত্যেকে প্রতিবছর কয়েকটি করে গাছ লাগাই এবং সেগুলোর যতœ নিই, তাহলে আমাদের চারপাশ অনেকটাই বদলে যাবে।
আখাউড়া উপজেলা সচেতন নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, আসলেই ইকবাল আহাম্মদ খান একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। তিনি নিজের টাকা খরচ করে দীর্ঘ বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়ে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে গাছ লাগানো জরুরি।
.png)