রেড লেডি পেঁপেতে স্বপ্নবুনন, দুই একরে ১৫ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার গোমতী ইউনিয়নের মাহবুব মেম্বার পাড়ায় গেলে চোখে পড়বে সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলে থাকা শত সহস্র পেঁপে। কোনোটি গাঢ় সবুজ, কোনোটিতে এসেছে লালচে আভা। দুই একর জমিজুড়ে সমন্বিত পরিচর্যায় শুরু করা সারি সারি গাছে থোকায় থোকায় ফলন এ যেন এক তরুণের স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। বাগানের মালিক মেহেদী হাসান রানা, বাড়ি উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়নের খেদাছড়া এলাকায়।
পাহাড়ি জনপদে যেখানে চিরাচরিত পদ্ধতিতে ফসল চাষই বেশি প্রচলিত, সেখানে ভিন্ন পথে হাঁটলেন রানা। বাণিজ্যিকভাবে শুরু করলেন তাইওয়ানের উচ্চফলনশীল ‘রেড লেডি’ জাতের পেঁপে চাষ। তবে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি আগ্রহোদ্দীপক গল্প।
২০২২-২৩ সালের গোড়ার দিকে ইউটিউবে বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক ভিডিও দেখে পেঁপে চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন রানা। সেই আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দিতে তার পাশে দাঁড়ান উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা, যারা পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে তাকে উৎসাহিত করেন।
.png)
এরপর খাগড়াছড়ির জিরো মাইল এলাকার এগ্রোসেল নার্সারি থেকে প্রায় দুই হাজার রেড লেডি জাতের পেঁপের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। জমি নিজের না থাকায় দুই বছরের জন্য দেড় লাখ টাকায় লিজ নিয়ে শুরু করেন বাগান। এরপর নিয়মিত পরিচর্যা, সময়মতো জৈব সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনাবাদি পাহাড়ি জমিকে চমৎকার একটি ফলন্ত বাগানে রূপান্তর করেন রানা।
কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের ফল এখন হাতেনাতে পাচ্ছেন রানা। বাগানের প্রতিটি গাছে ঝুলছে পরিপক্ব পেঁপে, আর গত মাস থেকে শুরু হয়েছে ফল সংগ্রহ ও বিক্রি। প্রতি কেজি পাকা পেঁপে ৩০-৪০ টাকা পাইকারি বিক্রি করেন রানা। ইতোমধ্যে বাগান থেকে প্রায় চার লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন তিনি। মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরও ফলন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন উদ্যোক্তা রানা। তার হিসাব অনুযায়ী, পুরো মৌসুম শেষে বাগান থেকে মোট ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি হতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান রানা বলেন, ‘পাহাড় এবং সমতলে পেঁপের চাহিদা ব্যপক সঠিক সেচ, জৈব সার ও নিয়মিত পরিচর্যায় ভালো ফলন পেয়েছি। গাছ পরিপক্ব হলে ফলন আরও বাড়বে। এ পর্যন্ত বাগান প্রস্তুত, চারা, সেচ ও পরিচর্যায় প্রায় ৮–৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা পেঁপে সংগ্রহ শুরু করেছেন। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এ বছর প্রায় ১৫–১৬ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করার আশা করছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে পেঁপে চাষ করতে চাই।’
মেহেদী হাসান রানার সফলতায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন স্থানীয় বেকার যুবকরাও। প্রতিদিন তার বাগান দেখতে ও পরামর্শ নিতে আসছেন তরুণরা। রানা মনে করেন, সরকারি সহায়তা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে পাহাড়ের অনাবাদি জমিতে পেঁপে চাষ বাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন রানার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘মেহেদী হাসান রানা একজন আগ্রহী ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তা। পেঁপে চাষে আগ্রহী হলে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রানার বাগানটি এলাকার অন্যান্য কৃষককেও বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে উৎসাহিত করবে বলে আশা করছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, রেড লেডি জাতের পেঁপে বাণিজ্যিক চাষের জন্য সম্ভাবনাময় একটি জাত। তিনি বলেন, ‘মাটিরাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়াও এ চাষের উপযোগী। সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করলে কৃষকেরা ভালো ফলন ও আয় করতে পারেন। রানার উদ্যোগটি অন্য কৃষকদেরও বাণিজ্যিক পেঁপে চাষে উৎসাহিত করবে।’