ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের শরীর ম্যাসাজের অভিযোগ!

নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৪৩, ৮ জুলাই ২০২৬
শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের শরীর ম্যাসাজের অভিযোগ!
ছবি: সংগৃহীত

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের শরীর ও মাথায় ম্যাসাজ করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

১০ দিনের ব্যবধানে দুটি ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জানা যায়, গত ৫ জুলাই উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের চারঘুরি চাপানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা কাজলী আক্তার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিশকাত মৌকে দিয়ে শ্রেণিকক্ষেই শরীরে ম্যাসাজ করিয়ে নেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

Advertisement

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামিয়ার রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে গত ২৫ জুন উপজেলার খগা বড়বাড়ী বালিকা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়েও একই ধরনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। অভিযোগ রয়েছে, সনাতন ধর্মীয় শিক্ষিকা তিলোত্তমা রানী রায় (কাব্যতীর্থ) নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে শরীর ও মাথায় ম্যাসাজ করিয়ে নিতেন। ভাইরাল ভিডিওতে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে তার শরীর ম্যাসাজ করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মারুফা বেগম লিজা জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। যদিও এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে চারঘুরি চাপানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘটনায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট চারজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, চারঘুরি চাপানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে শোকজ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে পত্র পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, খগা বড়বাড়ী বালিকা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনায় ৬ জুলাই অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবিরকে আহ্বায়ক এবং অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার আমির হামজা বোরহান উদ্দিন ও ব্যানবেইস কর্মকর্তা শাহানুর আলমকে সদস্য করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এ কারণে কিছু শিক্ষক দায়িত্ববোধের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাদের দাবি, শিশুদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ করিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার অনেক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। এ জন্য তারা সরকারি বিদ্যালয়ে পাঠদানের মানোন্নয়নে আন্তরিকতা দেখান না। এতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও তারা মনে করেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সেবা বা শরীর ম্যাসাজ করানো শিক্ষকতার নৈতিকতা, সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং শিশুর মর্যাদা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের পরিপন্থী। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং, জবাবদিহি ও নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই উপজেলার দুইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের প্রত্যাশা, তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: নীলফামারী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!