ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড, কী হয়েছিল সুজানা-কাব্যের?

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২০:০২, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড, কী হয়েছিল সুজানা-কাব্যের?
ইনসেটে সুজানা ও কাব্য- ফাইল ফটো

টিউশনির জন্য মেয়েকে এগিয়ে দিয়ে আসেন মা। কে জানতো এটাই শেষ দেখা মেয়ে সুজানা আক্তারের (১৭) সঙ্গে তার মা চম্পা বেগমের। বাসায় ফিরতে দেরি হাওয়ায় মেয়ের মোবাইল ফোনে কল দিতে থাকেন মা। রাত ৯টার দিকে মেয়ের ফোনে শেষ কল ঢোকে। এরপর থেকে বন্ধ পাওয়া যায় সুজানার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি। ঘটনাটি গত ১৬ ডিসেম্বরের।

এর পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকালে ভাসমান অবস্থায় সুজানার লাশ পাওয়া যায় কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোডের বউরারটেক এলাকায় পূর্বাচল উপ-শহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সেতুর নিচের লেকে। এ সময় লেক থেকে একটি হেলমেট ও ভ্যানেটি ব্যাগও উদ্ধার করে পুলিশ। যার সূত্র ধরে মেলে সুজানার সঙ্গেই লেকের পানিতে প্রাণ যাওয়া এক তরুণের। নাম তার কাব্য।

বাবা হারা সুজানা তার মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজধানীর কাফরুল থানার কচুক্ষেত এলাকায় থাকতেন। ভাষানটেক সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন সুজানা। মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলেন মা। মায়ের সেই স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।

Advertisement

৪ বছর আগে সুজানার বাবা মারা যান। বড় ভাই মেহেদী হাসান আহসানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে চাকরি খুঁজছেন। বাবাহীন সুজানা নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতেন টিউশনি করে। একসঙ্গে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চ মাধ্যমিকের নির্বাচনী পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল সুজানার। ছোটবেলা থেকে সাইকেল চালাতে পছন্দ করতেন। প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে বাইকে ঘুরতে বের হতেন। তবে, বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় কাব্যের সঙ্গে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হওয়ার কথা জানতো না সুজানার পরিবার।

গতকাল বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে সুজানার ভাই মেহেদী হাসান বলেন, সুজানা আর কাব্যের মৃত্যুটা পূর্ব শত্রুতার জেরে হয়েছে কিনা তদন্ত করা উচিত। কাব্যের শত্রু অথবা আমার বোনের কোনো শত্রু এ ঘটনা ঘটাতে পারে। এছাড়া হয়তো অন্য কোনো বন্ধু ওদের একসঙ্গে পেয়ে সন্দেহবশত ওদের মেরে ফেলতে পারে। এখন আমরা চাই প্রশাসন সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। আমরা সুজানা হত্যার বিচার চাচ্ছি।

এদিকে, সুজানার মোবাইলের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, সুজানা ও তার বন্ধু সাইনুর রশীদ কাব্য (১৭) ১৬ ডিসেম্বর মোটরসাইকেলে করে ঘুরতে বের হয়ে নিখোঁজ হন। সুজানার মরদেহ উদ্ধারের পর ১৮ ডিসেম্বর বুধবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা পূর্বাচলের লেকে তল্লাশি শুরু করেন। উদ্ধার হয় কাব্য ও তার নীল রঙের মোটরসাইকেল। কাব্য আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।

কাব্যের মা সোনিয়া রশিদ বলেন, ‘কাব্য প্রায়ই বাইক নিয়ে ঘুরতে বের হতো। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়ও মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয় সে। রাত ৯টার দিকে সর্বশেষ তার সঙ্গে কথা হয়। এরপর থেকে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সেদিন রাতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি কাব্যের। এ জন্য রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি জিডিও করি আমরা।’

নিহত কাব্যের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কাব্যের ফুফাতো ভাই আর সুজানা সহপাঠী ছিলেন। একই কোচিংয়ে যাতায়াতের সুবাদে সুজানার সঙ্গে কাব্যের পরিচয় হয়। মাসখানেক হয়েছে তাদের বন্ধুত্ব। সুজানা একাধিকবার তাদের বাড়িতে এসেছেন। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর যে তারা দুজন একত্রে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে কাব্যের পরিবার তা জানতো না।

কাব্যের মা সোনিয়া বলেন, ‘পুলিশ আমাদের বলছে, ওদের মৃত্যু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আমার দাবি থাকবে, পুলিশ যেন তদন্ত করে। আসলেই সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে নাকি তাদের হত্যা করা হয়েছে?’

এদিকে পুলিশের ধারণা- দ্রুত গতির মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লেকে পড়ে মৃত্যু হয় দুজনের। এরপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করবে পুলিশ।

নায়ারণগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল-গ) মেহেদী ইসলাম বলেন, নিহত দুজনের কারো কাছ থেকেই কিছু খোয়া যায়নি। দেখে দুর্ঘটনাই মনে হচ্ছে। এরপরও তদন্ত অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহের কাজ করছে পুলিশ।

রূপগঞ্জ থানার ওসি লিয়াকত আলী বলেন, দুই পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর লাশ দুটি যার যার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!