শুধু কৃষক বাবুল মিয়া নন, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ড ও সদরের চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ১৪১ জন কৃষকের একই অবস্থা। তারা সবাই বিনাধান-১১ ও বিনাধান- ১৭ চাষ করেছিলেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া এলাকার বেশিরভাগ কৃষক ধান কেটেছেন।
যারা বিনার উদ্ভাবিত ওই দুই জাতের ধান চাষ করেছেন সবার ধান চিটা হয়ে গেছে। চিটা থেকে ধান আলাদা করতে ব্যস্ত নারী-পুরুষ। কিন্তু শরীর খাটিয়ে পরিশ্রমে চাষাবাদ করে খরচের টাকা এই ধান চাষে অহেতুক খরচ হওয়ায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাজ করছেন তারা।
.png)
কৃষকরা জানান, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিনা) থেকে ৩৩ শতাংশ জমির জন্য ৫ কেজি করে বিনাধান- ১৭ ও বিনাধান-১১ এর বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এরমধ্যে কয়েকজন বিনামূল্যে সার পেলেও অনেকে পাননি। ১০ শতাংশ (এক কাঠা) জমিতে যেকোনো জাতের ধান চাষাবাদ করলে পাঁচ থেকে ছয় মণ ফলন পাওয়া যায়। অথচ বিনা উদ্ভাবিত ওই দুই জাতের উন্নত ধান চাষাবাদ করে ১০ শতাংশ জমিতে এক থেকে দেড় মণ ফলন হয়েছে। বিনামূল্যে বীজ ও সার পাওয়ার পরও প্রতি কাঠায় কৃষকের খরচ হয়েছে অন্তত চার হাজার টাকা। অনেক কৃষক ধারদেনা করে ধান চাষ করায় ধারদেনার টাকা পরিশোধ করা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন।
কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, দিনমজুরির পাশাপাশি নিজের তিন কাঠা জমিতে ধান চাষ করি। গত বছর বিনাধান-১৭ চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি। এবারও বিনামূল্যে ৫ কেজি বীজ ও ৫৮ কেজি সার পেয়েছি। গত বছরের মতো এবারো সঠিকভাবে পরিচর্যা করেছি। কিন্তু সব মিলিয়ে ধান পেয়েছি মাত্র সাড়ে ৭ মণ। বাকি সব চিটা হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, জমিতে নিজের শ্রম ছাড়া কীটনাশক, সেচ ভাড়া, শ্রমিকসহ আনুষঙ্গিক খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। এগুলো ধারদেনা করে ধান চাষে খরচ করেছি। এখন টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি। সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।
হেলাল উদ্দিন একজন বর্গাচাষি। তিনি বলেন, বিনাধান- ১৭ এর ১০ কেজি বীজ বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো ১২ কাঠা জমিতে চাষ করেছি। আমার বাছুরসহ একটা দুধের গাভী ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে চাষাবাদের খরচ মিটিয়েছি। কিন্তু এখন প্রতি কাঠায় ফলন হয়েছে এক থেকে সর্বোচ্চ দেড় মণ।
সাড়ে চার কাঠা জমিই সম্বল কৃষক মেজু উদ্দিনের। তিনি পুরো জমিতে বিনাধান- ১১ চাষ করেছেন। প্রতি কাঠায় ফলন পেয়েছেন এক মণ।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষক আব্দুল কাদির, রিপন মিয়া ও আতিকুল ইসলাম জানান, বিনাধান- ১৭ প্রতি কাঠায় সর্বোচ্চ এক মণ এবং বিনাধান-১১ প্রতি কাঠায় সর্বোচ্চ দেড় মণ হয়েছে। বাকি সব ধান চিটা হয়ে গেছে। উন্নত জাত বলে কর্মকর্তারা বিনামূল্যে বীজ দিয়ে চাষাবাদ করতে বলেছে। কৃষকরা সরল মনে চাষ করে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সম্প্রতি কর্মকর্তারা জমি পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে চিটা হয়ে গেছে। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তবে এখনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সব কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নয়ত সংশ্লিষ্ট কার্যালয় ঘেরাও করা হবে।
বিনাধান- ১৭ ও ১১ জাতের উদ্ভাবক বিনার সাবেক মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন বিনার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামছুন্নাহার বেগম।
বিনা সূত্রে জানা যায়, উচ্চ ফলনশীল, স্বল্প মেয়াদি, খরাসহিষ্ণু, আলোক সংবেদনশীল ও উন্নত গুণাগুণের বিনাধান- ১৭ জাতটি ‘গ্রিন সুপার রাইস’ হিসেবেও নামকরণ হয়েছে। ধান আগাম পেকে যাওয়ায় কাটার পর জমিতে সহজেই আলু, গম বা রবিশস্য চাষ করা যায়। ধান ও চাল লম্বা এবং চিকন, খেতে সুস্বাদু এ জাতটির বাজারমূল্য বেশি ও বিদেশে রপ্তানির উপযোগী। হেক্টরপ্রতি ৬.৮ টন থেকে সর্বোচ্চ ৮ টন পর্যন্ত ফলন হয়। ধানের এই জাতটি পাতা পোড়া, খোল পঁচা ও কাণ্ড পঁচা ইত্যাদি রোগ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিরোধ করতে পারে।
এ ছাড়া প্রায় সব ধরনের পোকার আক্রমণ, বিশেষ করে বাদামি গাছফড়িং, গলমাছি ও পামরি পোকার আক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেক বেশি। এ জাতের ধানটি উদ্ভাবনে পাঁচ বছর গবেষণা করা হয়েছে। ২০১৫ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাত হিসেবে সারা দেশে আমন মৌসুমে চাষের জন্য বিনাধান- ১৭ নামে অনুমোদন দেয়। এছাড়া বিনাধান- ১১ বন্যা সহিষ্ণু, স্বল্পমেয়াদি ও অধিক ফলনশীল আমন ধানের জাত। এ জাতটি ২৫ দিন পযর্ন্ত পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে।
এমনকি পানিতে তলিয়ে পঁচে গেলেও শুকানোর পর ধানের গোড়া থেকে ফের ডগা বা পাতা গজায়। অর্থাৎ নতুন করে ধান রোপণ করতে হয় না। দেশের আকস্মিক বন্যাপ্রবণ ও বন্যামুক্ত উভয় এলাকাতেই আমন মৌসুমে বন্যা সহিষ্ণু এ জাত চাষাবাদের উপযোগী। জলমগ্ন অবস্থায় এই জাতে প্রতি হেক্টরে ৪.৫ টন এবং বন্যামুক্ত জমিতে ফলন ৫.০-৫.৫ টন পাওয়া যায়। স্থানীয় জাতের চেয়ে বিনাধান- ১১ চাষে সার, পানিসহ বিভিন্ন খরচ ৫০ শতাংশ কম লাগে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ময়মনসিংহের উপপরিচালক ড. নাছরিন আক্তার বানু বলেন, উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত গুণাগুণের এসব জাতগুলো চাষাবাদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক কৃষক। ফলে আগামীতে জাতগুলো চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন বীজ-সারসহ সবধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামছুন্নাহার বেগম বলেন, বিনা থেকে এ বছর ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জে এক হাজার ৮০ কেজি বিনাধান- ১৭ এর বীজ ও ২২৯ কেজি বিনাধান- ১১ এর বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ৩৩ শতাংশ জমির জন্য একেকজন কৃষক পেয়েছেন ৫ কেজি বীজ। সব এলাকায় ফলন ভালো হলেও শুধুমাত্র ময়মনসিংহের ১৪১ জন কৃষকের ধান চিটা হয়ে গেছে। অথচ গতবছরও বাম্পার ফলনে খুশি ছিল কৃষকরা।
তিনি আরো বলেন, চিটা হওয়ার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমি সেই কমিটির সভাপতি। তবে আমাদের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জমি পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে চিটা হয়েছে। এছাড়া সার ও কীটনাশক কম-বেশি দেওয়াসহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সঠিকভাবে যত্ন না করার কারণেও চিটা হয়েছে।