শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং পেটের ক্ষুধা মেটাতে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের বেশি চাওয়া পাওয়া নেই। শুধু চাই আমাদের কাজের ন্যায্য মজুরি। আমরা খেয়ে-পরে বাঁচতে চাই, আর সেই জন্যই আমাদের এই জীবনসংগ্রাম।’ শ্রমিকদের এই আন্দোলন বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে দানা বাঁধছে এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রতিদিন বাড়ছে।
রোববার সকাল ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চক্রবর্তী এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নিলে সড়কের দুই পাশেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি পড়ে। ফলে ব্যস্ত এই মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। বেলা ১১টার দিকে শিল্পপুলিশ র্যাব ও সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
.png)
বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের গত সেপ্টেম্বর মাসের বকেয়া বেতন এখনো দেওয়া হয়নি। এছাড়াও কারখানার সব শ্রমিকদের সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়েছে। বেতনের সময় হলে শুরু হয় তালবাহানা।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, প্রতিমাসের নির্ধারিত সময়ে বেতন না পাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রতিদিন নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে কাজ করলেও, মাস শেষে মজুরি না পেয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছেন। শ্রমিকরা বলেন, আমরা বাঁচার জন্য কাজ করি। আমাদের কোনো বেশি চাওয়া নেই। শুধু চাই আমাদের ন্যায্যমজুরি যেন সময়মতো দেওয়া হয়।
এক শ্রমিক বলেন, আমরা প্রতিদিন সকালে কাজ করতে আসি, নিজেদের রক্ত-ঘাম দিয়ে কারখানায় শ্রম দিই। কিন্তু মাস শেষে বেতন না পেলে কীভাবে চলব? আমাদের পরিবার আছে, ঋণ আছে, জীবন চালাতে প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আর এই বেতনের জন্য আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে।
মহাসড়কে অবরোধ চলাকালীন কারখানার প্রধান ফটকের সামনে ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের মুখে ছিল ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ। এক শ্রমিক বলেন, আমরা ছুটি চাই না, কাজ করতে চাই। কিন্তু যদি ছুটি দিতেই হয়, তাহলে আমাদের বকেয়া বেতন এবং পাওনা টাকা পরিশোধ করে ছুটি দিতে হবে।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রাসেল নামের আরেক শ্রমিক বলেন, প্রতিবার বেতন দেওয়ার সময় হলে কারখানা কর্তৃপক্ষ তালবাহানা শুরু করে। আমরা আর এই অন্যায় সহ্য করতে পারছি না। আমাদের পাওনা টাকা চাই, তা না হলে আমরা রাস্তায় নামতেই থাকব।
শ্রমিকদের অনেকেই জানান, তাদের ন্যায্যবেতন না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে ঋণগ্রস্ত অবস্থায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবার চালানোর জন্য অন্য জায়গায় ছোটখাটো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শ্রমিকদের এই অবরোধের ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন অফিসগামী যাত্রী এবং যানবাহনের চালকরা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে পড়েন। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিলেন, তাদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়।
রাস্তার মধ্যে আটকে পড়া বাসযাত্রী সুমন বলেন, আমরা পূজার ছুটিতে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই অবরোধের কারণে অনেক সময় ধরে আটকে আছি। কখন পৌঁছাবো জানি না।
শুধু যাত্রী নয়, আশপাশের এলাকার ছোট ব্যবসায়ী ও পথচারীরাও এই অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক ছোট ব্যবসায়ীরা জানান, মহাসড়ক অবরোধের কারণে তাদের দোকানে ক্রেতা আসতে পারছেন না, ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। এছাড়াও, বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহনও আটকে পড়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে।
বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কাশিমপুর থানা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে অবগত রয়েছি এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।