উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নানা ধরনের গ্রামীণ খেলা। আয়োজনের মধ্যে ছিল সাঁতার প্রতিযোগিতা, পুকুরে হাঁস ধরা, তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে মোরগ নামানো, মুখে চামুচে নি মার্বেল নিয়ে দৌড়, চেয়ার খেলা এবং হাঁড়ি ভাঙা। এই খেলাগুলো বর্তমান সময়ের ডিজিটাল বিনোদন মাধ্যমের বিপরীতে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে।
উৎসবের সকালটা শুরু হয় সাঁতার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। গ্রামের ছেলেরা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রতিযোগিতার উত্তেজনা গ্রামবাসীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়। এরপর আয়োজিত হয় পুকুরে হাঁস ধরা প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রতিযোগীরা কৌশলে পানির মধ্যে হাঁস ধরার চেষ্টা করেন। দর্শকরা খেলা দেখে মুগ্ধ হন এবং গ্রামের ছোট-বড় সবাই উৎসাহিত হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে মোরগ নামানো প্রতিযোগিতা। একে একে প্রতিযোগীরা তৈলাক্ত বাঁশে উঠে মোরগ নামানোর চেষ্টা করে।
.png)
ছোট বারুইল গ্রামে এই খেলাধুলার মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতিসহ সমাজের বন্ধন আরো দৃঢ় হচ্ছে। উৎসবটি গ্রামের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকে বলে জানায় খেলায় অংশগ্রহণকারীরা।
সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া আশরাফুল বলেন, ‘এই দিনটার জন্য আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। প্রতিবছরই আমি সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেই। এ বছর ৩০০ মিটার সাঁতার প্রতিযোগিতায় সবাইকে পিছে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করি। মূলত প্রথম হওয়াই লক্ষ্য না। সবার সঙ্গে অন্যরকম ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।’
হাঁস খেলায় অংশ নেয়া নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বড় পুকুরের মধ্যে ৩০-৪০ জন যুবক একটি হাঁসকে তাড়া করে কে কার আগে সেটা ধরবে এমন খেলাটাই আমাদের অন্যরকম আনন্দ দেয়। দেড় ঘণ্টা সবাই যার যার মতো করে চেষ্টা করে। আমি হাঁসের কাছে গিয়ে ডুব দিয়ে সেটাকে ধরতে সক্ষম হই। ধরার পর যে কি আনন্দ সেটা বোঝানোর ভাষা আমার নেই।’
গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এই খেলা আমাদের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের খেলা আমাদের শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ছোট বেলায় আমাদের খেলা বলতে এগুলোই ছিল। এখনকার ডিজিটাল যুগে এসব খেলা হারিয়ে গেছে। আজ এসব খেলা দেখে অন্যরকম আনন্দ লাগবে।’
গ্রামের গৃহবধু তানিয়া বেগম বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন গ্রামের সবাইকে একত্রিত করে। তরুণ থেকে বৃদ্ধ সবাই মিলে একসঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে, যা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করে। এই উৎসব আমাদের গ্রামের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। এটা শুধু খেলা নয় বরং আমাদের গ্রামের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ।’
এলাকার বাসিন্দা সেলিম বলেন, ‘এই উৎসব আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। ডিজিটাল বিনোদনের যুগে এই ধরনের খেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, তবে এখনো আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখতে পারছি। যারা আয়োজন করছে তারাও তরুণ। আমরা চাই এমন আয়োজন আমাদের গ্রামে প্রতিবছর অব্যাহত থাকুক।’
উৎসবের আয়োজক কমিটির প্রতিনিধি মিলন হোসেন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘এমন খেলার আয়োজন শুধু আনন্দের মাধ্যম নয় বরং এটি গ্রামের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা বাড়ায়। ডিজিটাল যুগে যখন গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ছোট বারুইল গ্রামে আগামী বছরগুলোতেও এই উৎসব চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামীতে এই উৎসব শুধু ছোট বারুইল গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে এবং আরো বেশি মানুষ এতে অংশ নেবে।’
দিনব্যাপী চলা এই আয়োজনে সহযোগিতা করেন আকিব হোসেন, নজরুল ইসলাম, ছবেদ আলী, সাকিবসহ আরো অনেকে।