চক্রের মাধ্যমে সাজানো অভিযোগে নিরীহ লোকজনকে টার্গেট করে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আপত্তিকর ছবি তুলে সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল করাসহ নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
আদ্রিতার প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী পাকুটিয়া ইউপি সদস্য মো. খোকন মিয়া ন্যায়বিচার চেয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, টাঙ্গাইলের দুদকের উপ-পরিচালক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক বরাবর চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি এখন সবার সামনে আসায় নাগরপুরে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
.png)
ভুক্তভোগী টাঙ্গাইলের নাগরপুরের পাকুটিয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য রাথুরা গ্রামের মো. খোকন মিয়ার অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে উল্লেখিত সচিব আদ্রিতার সঙ্গে একত্রে কাজ করাকালীন সময়ে মোবাইলে তার ছবি ধারণ করে তাকে ব্লাক মেইল করে তার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ একাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং নগদ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন। আদ্রিতার মা গাজিপুর জেলা শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম (ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত) তার মাকে ভারতে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা বাবদ ২ লাখ, আকুর ঠাকুরপাড়া মুক্তা ক্লিনিকে অপারেশন বাবদ ২ লাখ এবং থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা বাবদ ৩ লাখ টাকা খোকনের কাছ থেকে ধার নেন। আদ্রিতা তখন বলেন, থাইল্যান্ড থেকে এসে ধার করা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেব। থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আসার কিছুদিন পর আদ্রিতার কাছে ধারের টাকা ফেরত চাইতে গেলে খোকনের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল করাসহ নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন এবং আরো টাকা দাবি করেন।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, আদ্রিতা অস্থিত্বহীন ভুয়া জন্ম সনদ তৈরি করে অসৎ উপায়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি কোনো প্রকার ছুটির দরখাস্ত না দিয়ে নিয়মিত অফিস না করে বিভিন্ন জায়গায় অনৈতিক ভ্রমণ করতে যান। সত্যতা মিলবে তার মোবাইল রেকর্ড লিস্ট ও পাসপোর্ট চেক করলে। তার অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে পাকুটিয়া ইউনিয়নবাসী অতিষ্ঠ।
অভিযোগের ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আদ্রিতা রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে উপজেলা অফিস সূত্রে জানতে পেরেছি।
জাল জন্ম সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি কীভাবে জাল সনদ তৈরি করবো। জন্ম সনদের দরখাস্তের ওটিপি নম্বর চেয়ারম্যানের আইডিতে যায়। বিষয়টি চেয়ারম্যান দেখেন।
অফিসে অনুপস্থিত ও খোকনের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল করাসহ নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানোর হুমকি, টাকা আত্মসাৎ ও আরো টাকা দাবি বিষয়গুলি জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেন নি।
সচিব আদ্রিতা রহমানের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাকুটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মা, মেয়ে টাঙ্গাইল জেলা চালান। তাদের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। তার মা টাঙ্গাইলের সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার ছিল এখন গাজিপুরে। কিন্তু তার ক্ষমতা অনেক।
পাকুটিয়া ইউপির হিসাব সহকারী মো. সুমন বলেন, জন্ম সনদ তৈরি করার সময় চেয়ারমানের আইডি সচিব ব্যবহার করেন। আর সচিবের আইডি আমরা ব্যবহার করি।
তিনি আরো বলেন, তিনি তো নিয়মিত অফিসে আসেন না।
ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন গ্রাম পুলিশ জানান, সচিব নিয়মিত অফিসে আসেন না। আসলেও বেশি সময় থাকেন না।
বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ সচিব সমিতি (বাপসা) টাঙ্গাইল শাখার সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম খোকন বলেন ,তার কর্মকাণ্ডের কারণে আমরা সচিবরা তাকে সদস্য করিনি। আমরাও তার বিচার চাই।
নাগরপুর উপজেলার নির্বাহী অফিসার রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, পাকুটিয়া ইউনিয়নের সচিবের বিরুদ্ধে একটি অনিয়ম, দুর্নীতির তদন্ত এসেছিল। বিষয়টির তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
গত ২০২২ সালের ৭ জুন ইউনিয়ন পরিষদ সচিব ও হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ১৬ জুলাই লিখিত এবং ১৭ জুলাই ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা ফলাফল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১২ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। সেখানে আদ্রিতা রহমান সর্বোচ্চ ৬৯ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। তিনি লিখিত পরীক্ষায় ৬০ ও ব্যবহারিকে শূন্য এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৯ নম্বর পান। চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর শহরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ঐ প্রার্থীর বিষয় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং নিয়োগ কমিটির কাছে অভিযোগ করেন।
নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলেন জেলা প্রশাসক আতাউল গনি, সদস্য ছিলেন পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার, টাঙ্গাইল পৌর সভার মেয়র এস এম সিরাজুল হক আলমগীর, স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শামীম আরা রিনি ছিলেন সদস্য সচিব। কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে পরীক্ষার পূর্ব রাত্রে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংরক্ষণ ও পরীক্ষার দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়।
এদিকে ওই প্রার্থী সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে নিয়োগ পাওয়ার ফলে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠায় অধিকতর যাচাইয়ের স্বার্থে তার পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক তার কক্ষে ওই প্রার্থীর পুনরায় পরীক্ষা নেন। পরীক্ষায় তিনি এলোমেলো আচরণ করেন এবং কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তাই তার লিখিত পরীক্ষার নম্বর ও বাস্তব পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে অসামঞ্জস্য হওয়ায় নিয়োগ কমিটির সদস্যদের কাছে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে যে তিনি যে কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেই কেন্দ্রের সচিব, সহকারী সচিব ও কক্ষে ইনভিজিলেটেরর প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রার্থী এই অস্বাভাবিক নম্বর পেয়েছেন।
পরীক্ষার কেন্দ্রটি প্রার্থীর মা (তৎকালীন টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা) কর্মকর্তা লায়লা খানমের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় কেন্দ্র সচিব, সহকারী সচিব ও ইনভিজিলেটর দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অগোচরে পরস্পর যোগসাজসে সর্বোচ্চ নম্বর পেতে সহায়তা করেন।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসক প্রকৃত ঘটনা উদঘানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের বিশেষ বিভাগ সিআইডি দিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তারপর কীভাবে তিনি নিয়োগ পেলেন তা নিয়েও রয়েছে ধুম্রজাল।