ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চোরাই কারবারে কোটিপতি

রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১৮:৩০, ১৭ জুলাই ২০২৪
চোরাই কারবারে কোটিপতি
ছবি অলংকরণ: ডেইলি বাংলাদেশ

* এক মোবাইলেই লাভ ৪৫ হাজার
* চোরাই কারবারির হোতা কারা
* রাশেদের অঢেল সম্পদ
* ভারত-দুবাইয়ে নিয়মিত যাতায়াত
* রাশেদরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে
* কী বলছে পুলিশ
* যেভাবে উদ্ধার হয়েছিল ভারতীয় তরুণীর ফোন

ভারতে বসে সেখানকার চোরাই মোবাইল ফোন সংগ্রহ করে কৌশলে বাংলাদেশে প্রবেশ করান চোরাকারবারিরা। এরপর ফোনগুলোর একটি বড় অংশ চলে আসে চট্টগ্রাম নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারে। এখানে চোরাই মোবাইল ফোন বেচাকেনার খবর পুরোনো। এবার ভারতীয় তরুণীর হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Advertisement

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি নতুন মোবাইল ফোন বিক্রি করে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন দোকানিরা। অন্যদিকে, এক চোরাই মোবাইলেই লাভ হয় ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তাছাড়া চোরাকারবারিদের প্রধান টার্গেট থাকে আইফোন। একেকটি চোরাই আইফোন বিক্রি করে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা হয়। বাজারমূল্যের চেয়ে কমে পেয়ে সন্তুষ্ট হন ক্রেতারাও। ফলে চোরাই মোবাইল বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে- চোরাই মোবাইল বেচাকেনা কিংবা ব্যবহারের সুযোগ নেই। চোরাকারবারে জড়িতদের ধরতে কাজ চলছে। শিগগির চালানো হবে অভিযান।

মাসখানেক আগে ভারতে চুরি হওয়া একটি মোবাইল ফোন রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, এর আগে রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কেনা আইফোন নিয়ে ভারতে গিয়ে সেখানকার পুলিশের হাতে আটক হন শাহ আলম নামে একজন। রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কম দামে ফোনটি কিনেছিলেন তিনি। দেশে ফোনটি ব্যবহারে কোনো সমস্যা না হলেও চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে তিনি আটক হন।

তথ্য বলছে- শুধু শাহ আলম নন, গত ছয় মাসে এভাবে ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একাধিক ব্যক্তি। যাদের অনেকে জানতেনই না- তাদের ব্যবহৃত ফোনটি চোরাই।

এক মোবাইলেই লাভ ৪৫ হাজার:

রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক মোবাইল ব্যবসায়ী জানান, বর্তমান বাজারে একটি আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স মডেলের মোবাইলের মূল্য দেড় লাখ টাকা। এই মোবাইল ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ভারতের চোরাকারবারিরা। একেকটি মোবাইল বাংলাদেশে আনতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। এরপর দোকানে তুলে বিক্রি করা হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। এভাবে একেক মোবাইলে ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন বিক্রেতারা।

যেখানে একটি নতুন মোবাইল বিক্রি করে লাভ করা হয় এক থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা। সেখানে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকার লোভে অবৈধ কারবারে জড়াচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। 

চোরাই কারবারির হোতা কারা:

ব্যবসায়ীরা জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজারে চোরাই মোবাইল ব্যবসার অন্যতম হোতা মোহাম্মদ রাশেদ। বাজারের অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন ব্যবসায়ী এটির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে হেলাল, তারেক ও রুবেলসহ কয়েকজনের নাম সবার জানা।

চোরাই মোবাইলের কারবারে জড়িয়ে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন একেকজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানলেও অজানা কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান তারা। 

রাশেদরাশেদের অঢেল সম্পদ:

জানা গেছে, রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোহাম্মদীয়া প্লাজায় ‘মিশমা টেলিকম’ নামে একটি মোবাইল দোকানের মালিক রাশেদ। দোকানটিতে সবসময় বসেন তার ভাই কায়সার। মূলত সেই দোকান থেকেই চট্টগ্রাম নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় চোরাই মোবাইল সরবরাহ করা হয়। ভারতীয় চোরাই মোবাইল কৌশলে এনে দোকানে রাখেন রাশেদ। একইভাবে বাংলাদেশে চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইলগুলোও সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দেন দুবাই। সেখান থেকে চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে।

রাশেদের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছিলেন তিনি। সেখান থেকে কয়েক বছর আগে ফিরে আসেন দেশে। শুরুতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে একটি মোবাইলের দোকানে চাকরি নেন। একপর্যায়ে মোবাইল চোরাচালানে জড়িতদের সঙ্গে সখ্য গড়ে নিজেই হয়ে ওঠেন মোবাইল দোকানের মালিক।

মোবাইল চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান রাশেদ। গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ায় গড়ে তোলেন অট্টালিকা।

আরো জানা গেছে, কয়েকমাস আগে বাংলাদেশে মোবাইল পাচারকালে ভারতে গ্রেফতার হয়েছিলেন রাশেদ। দেশটির এক পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ের মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় কলকাতার বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও রাশেদের বক্তব্য না পাওয়ায় বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মূলত রাশেদের মোবাইল চোরাচালানে জড়িত থাকার বিষয়টি জানাজানি হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে দেশে ফেরার সময় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার ব্যাগ তল্লাশি করে ২২টি দামি মোবাইল ফোন, চার লিটার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, ১৭টি শাড়ি, ১৭টি থ্রিপিস ও ৪০টি টি-শার্ট জব্দ করা হয়। প্রথমে কাস্টমস কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গেলেও পরে মাঠে আর্মড পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। এরপর তাকে পুনরায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জব্দ মালামালের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন চন্দ্র ভৌমিকের সই করা সেই জব্দ তালিকার মন্তব্য অংশে লেখা হয়- ‘যাত্রী (রাশেদ) ব্যাগেজ ঘোষণা প্রদান করেননি। তিনি বারবার যাতায়াত করেন। যাত্রী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ও বাণিজ্যিক পরিমাণে পণ্য আনয়ন করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। তাই পণ্যগুলো শিফট ইনচার্জের নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী আইনানুগ নিষ্পত্তির জন্য সাময়িকভাবে আটক করা হলো এবং ডিএম কপিটি বিচার শাখায় প্রেরণ করার জন্য সুপারিশ করা হলো।

জব্দ তালিকা প্রস্তুত করার পর ছেড়ে দেওয়া হয় রাশেদকে। পরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।

ভারত-দুবাইয়ে নিয়মিত যাতায়াত রাশেদের:

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বলছেন, মাসে একাধিকবার ভারতে যাতায়াত করেন রাশেদ। পাশাপাশি দুবাইয়েও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তার। সন্দেহজনক যাতায়াতের অনুসন্ধানে জানা গেছে- ভারতে চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল দেশে নিয়ে আসেন রাশেদ। কিছু নিজে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। বাকিগুলো বিভিন্নজনের মাধ্যমে নানা কৌশলে সীমান্ত দিয়ে নিয়ে আসেন।

আরো ‘রাশেদ’ আছেন রিয়াজউদ্দিন বাজারে:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, রাশেদ একসময় বিক্রয়কর্মী থাকলেও হঠাৎ চোরাকারবারে জড়িয়ে হয়ে ওঠেন বড় ব্যবসায়ী। এখন বেশিরভাগ সময় থাকেন কলকাতায়। সেখান থেকে মোবাইল সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে পাঠান। তার মতো আরো কয়েকজন রিয়াজউদ্দিন বাজারেই রয়েছেন।

রাশেদরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে:

অভিযোগ রয়েছে- দিনের পর দিন চোরাই মোবাইলের ব্যবসা চলে আসলেও পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান হোতারা। সবশেষ ভারতীয় তরুণীর মোবাইল উদ্ধারের ঘটনায়ও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

কী বলছে পুলিশ:

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ভারতীয় তরুণীর মোবাইল উদ্ধারের পর চোরাই মোবাইল ব্যবসার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা আরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। এরপর অভিযান পরিচালনা করা হবে।

উদ্ধার হয়েছিল ভারতীয় তরুণীর ফোনযেভাবে উদ্ধার হয়েছিল ভারতীয় তরুণীর ফোন:

গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মহেশতলা থানা এলাকায় নিজের ব্যবহৃত আইফোন ১৪ প্লাস মোবাইল হারান দীপান্বিতা সরকার নামে এক তরুণী। এ ঘটনায় সেখানকার থানায় জিডি করেন তিনি। পরবর্তীতে প্রযুক্তির কল্যাণে দীপান্বিতা জানতে পারেন- তার হারানো মোবাইলটি সচল রয়েছে চট্টগ্রামে।

এরপর তিনি যোগাযোগ করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে। দীপান্বিতার ডাকে সাড়া দিয়ে মোবাইলটি উদ্ধারে অভিযানে নামে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। শনাক্ত করে চোরাই মোবাইল বেচাকেনা চক্রের হোতাসহ কয়েকজনকে। কিন্তু এরমধ্যেই বিষয়টি টের পেয়ে যান হোতা। ফলে দীপান্বিতার মোবাইলটি কৌশলে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়ে সটকে পড়েন তিনি। পরে মোবাইলটি ফিরিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায় দীপান্বিতার কাছে।

এক মাস আগে গত ৬ জুন রিয়াজউদ্দিন বাজারের জলসা মার্কেট থেকে মোবাইলটি উদ্ধার করা হলেও ৭ জুলাই বিষয়টি জানায় নগর পুলিশ।

মোবাইলটি উদ্ধারের দায়িত্বে ছিলেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের (বন্দর ও পশ্চিম জোন) এসআই মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম।

উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু মোবাইলটিতে কোনো সিম ঢুকানো হয়নি। তাই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তদন্ত শুরু করা হয়। প্রথমে রিয়াজউদ্দিন বাজারে কারা ভারত থেকে চোরাই মোবাইল আনে তার খোঁজ নিয়ে তালিকা প্রস্তুত করি। এ তালিকায় চারজনের নাম পাওয়া যায়। এরমধ্যে তিনজনই তামাকুমন্ডি লেন এলাকার। বাকি একজন জলসা মার্কেটের। 

তিনি বলেন, শনাক্ত হওয়ার পর আমরা জলসা মার্কেটে টার্গেট করা দোকানে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিষয়টি টের পেয়ে অভিযুক্ত দোকান মালিক ফোনটি একজন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেন। গত ৬ জুন মোবাইলটি আমরা পাই। এরপর থেকে জলসা মার্কেটের ঐ দোকানটি বন্ধ রয়েছে। আমরা শিগগিরই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করবো।

একটি সূত্র জানিয়েছে, এসআই রবিউল যে চারজনের কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে গত ৩১ মে দুজনকে আটক করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন- তারেক ও হেলাল। তাদের দোকানে থাকা বেশ কিছু মোবাইলও গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরে অজানা কারণে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ছেড়ে দেওয়া সেই দুজনের মধ্যস্থতায় জলসা মার্কেটের চোরাই কারবারি রুবেলের দোকান থেকে ভারতীয় তরুণীর মোবাইলটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু রুবেলকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!