দুদক বলছে, বাস্তবে মূল্য সাত কোটি টাকা হলেও সাত ভাগের এক ভাগ দামে এসব স্ক্র্যাপ বিক্রি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে এতে ছয় কোটি টাকার ‘ঘাপলা’ দেখছে দুদক।
মঙ্গলবার (১৪ মে) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ছয় ঘণ্টা বন্দরে অভিযান চালায় দুদকের তিন সদস্যের একটি দল। সেই অভিযানে অনিয়মের তথ্যটি বেরিয়ে আসে। অভিযানটিতে নেতৃত্ব দেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক।
.png)
জানতে চাইলে দুদকের এ কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে লোহার স্ক্র্যাপ বিক্রির দরপত্র আহ্বান করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাস্তবে সেখানে সাত কোটি টাকার লোহার স্ক্র্যাপ থাকলেও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে সেগুলো মাত্র এক কোটি ২১ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তারা। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন অতি শিগগিরই দুদকের প্রধান কার্যালয় বরাবরে দাখিল করা হবে।
অভিযানে থাকা দুদকের এক সদস্য জানান, অভিযানে সংশ্লিষ্ট শাখার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। কাগজপত্র যাচাইকালে দেখা যায়- টেন্ডারের কার্যক্রম শেষ হলেও ঠিকাদারের কাছে সরবরাহ করা হয়নি মালামাল। প্রকৃত মূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা হলেও মাত্র এক কোটি ২১ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয় লোহার স্ক্র্যাপ। ফলে হিসেবে পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ টাকার হেরফের দেখা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার শাখার ৩১, ৩২, ৫৮, ৫৯, ও ৬০ নম্বর লটে লোহার স্ক্র্যাপসহ অন্যান্য মালামাল বিক্রির কাগজ, রেকর্ডপত্র, স্টক রেজিস্ট্রার, মুভমেন্ট রেজিস্ট্রার ও স্টক করা মালামাল সরেজমিন পরিদর্শনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
বন্দরের ভান্ডার শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর ডাকা সেই দরপত্রে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ৩১, ৩২, ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর পাঁচটি লটে স্ক্র্যাপ বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ৫৮ নম্বর লটে ৫০ টন বা ৫০ হাজার কেজি স্ক্র্যাপ দেখানো হয়। এ লটে রয়েছে- জাহাজ ও পন্টুনের পুরাতন প্রেইট, অ্যাঙ্গেল, গার্ডার ও অকেজো মালামাল। ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা দাম দেখানো হয়। একইভাবে ৬০ নম্বর লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ একই দেখানো হয়। মালামালও একই ধরনের। ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা দাম ধরা হয়। প্রকৃতপক্ষে এ দুই লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ প্রায় ৭৫০ টন।
কার্যাদেশ পাওয়ার পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীর কাছে মালামাল বিক্রির চেষ্টা করেন মেসার্স আল-আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক আল আমিন। স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী আলমগীরকে ৫৮ ও ৬০ নম্বর লটের স্ক্র্যাপগুলো দেখান তিনি।
দুদক জানায়, ৫৮ নম্বর লটে ১৫০ টন ও ৬০ নম্বর লটে ৬০০ টনের কার্যাদেশ পাওয়া গেছে। প্রতি টন স্ক্র্যাপ ৬০ হাজার টাকা দরে কিনে নিতে চান আলমগীর। এজন্য আল আমিনকে কার্যাদেশ দেখাতে বলেন তিনি। তবে আল-আমিন দুই লটে মাত্র ১০০ টন স্ক্র্যাপের বৈধ কাগজ দেখাতে পারেন। তাই স্ক্র্যাপ নিতে অস্বীকার করেন আলমগীর। এরপর এ খবর বাইরে প্রকাশ পায়।
সবশেষ পাওয়া তথ্যে, চট্টগ্রামের সীমা স্টিল মিলের কাছে চার কোটি ৮৫ লাখ টাকায় স্ক্র্যাপগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন আল-আমিন। এ নিয়ে বন্দরজুড়ে চলছে তোলপাড়। একইভাবে ১৬ জানুয়ারি মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্সকে ৩১, ৩২ ও ৫৯ নম্বর লটের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৩১ নম্বর লটের মালামালের দাম দুই লাখ ২৭ হাজার ৯০০ টাকা ধরা হয়। ৩২ নম্বর লটের সাত হাজার ১১৬ কেজি স্ক্র্যাপের দাম ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা ধরা হয়। ৫৯ নম্বর লটের স্ক্র্যাপের পরিমাণ ৯৫ টন দেখানো হয়। অথচ এ লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ ৩৫০ টনের বেশি। ইব্রাহিম নিজেই স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী হওয়ায় অন্যের কাছে মালামাল বিক্রি করেননি।
বন্দরের ভান্ডার শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর লটে স্ক্র্যাপের পরিমাণ এক হাজার ১০০ টনের বেশি। অথচ দেখানো হয়েছে মাত্র ১৯৫ টন। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক স্ক্র্যাপগুলো লুটপাট করেছেন।
সেই অসাধু কর্মকর্তা হিসেবে উঠে এসেছে ভান্ডার শাখার কর্মকর্তা কন্ট্রোলার অব স্টোরস (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবদুল হান্নানের নাম। অভিযোগ উঠেছে, নামমাত্র মূল্যে কার্যাদেশ দিয়ে পুরো টাকা দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিয়ে ভাগভাটোয়ারা করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবদুল হান্নানের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।