জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চুয়াডাঙ্গার ৪ উপজেলায় মোট ২৯৩ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। উপজেলা ওয়ারি দামুড়হুদা উপজেলায় ৪৫ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৬২ হেক্টর, জীবননগর উপজেলায় ১৩১ হেক্টর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৬৫ হেক্টর। চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলার ২৯৩ হেক্টর লিচু বাগান থেকে ২৪০ মেট্রিক টন লিচু ফলনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি অফিসের একটি সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে সব বাগানে মুকুল আসেনি। তাছাড়া টানা প্রায় দেড় মাসের দাবদাহে অধিকাংশ গাছের লিচু ঝরে পড়ায় ফলন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। এতে লোকসান গুণতে হবে চাষিদের।
.png)
কৃষকরা বলছেন, বৈরি আবহাওয়ার কারণে পরিপক্ক হওয়ার আগেই গাছ থেকে লিচু পাড়তে হচ্ছে। কারণ গাছ থেকে লিচু ঝরে পড়ছে। গাছে লিচু ফেটে যাচ্ছে। তারপর কাঙ্খিত দাম না থাকায় লোকসান গুণতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
কিন্তু হতাশার বিষয়, লিচু চাষিরা লোকসান গুণলেও লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পরিপক্ক হওয়ার আগেই লিচু বাজারে আসায় লিচুর স্বাদও কমছে বলে জানান ভোক্তারা।
চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারে লিচু কিনতে আসা সদর উপজেলার ভীমরুল্লা গ্রামের ইকরামুল মোল্লা জানান, বাজারে নতুন ফল এসেছে। তাই ছেলে-মেয়েদের জন্য কিনেছেন। যদিও একটু স্বাদ কম টক বেশি। আরো কিছুদিন গাছে থাকলে লিচু পুষ্ট হতো স্বাদও পাওয়া যেতো।
লিচু চাষি দামুড়হুদা জয়রামপুর গ্রামের আব্দুল আলিম জানান, তার বাগানে শতাধিক লিচু গাছ থাকলেও ফল এসেছে অর্ধেকের কম গাছে। আবার গত বছরের তুলনায় সেই গাছগুলোতে লিচু দাঁড়িয়েছে কম। আর রোদ্রের তাপে গাছ থেকে লিচু একাই ঝরে পড়ছে। গাছের গোড়াই পানি দিয়েও তেমন একটা ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যেগুলো গাছে আছে, তা আবার আকারে ছোট। যার কারণে এবার বাগানে যা লিচু পাওয়া যাবে তা আগের বছরের (গত বছর) তিন ভাগের এক ভাগ।
দামুড়হুদা বাসস্ট্যান্ড বটতলায় লিছু কিনতে আসা মিরাজুল ইসলাম জানান, বাজারে প্রকারভেদে লিচুর দাম এবার একটু চড়া। প্রতি পোন (৮০টা লিচু) লিচুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। সে হিসেবে প্রতি পিস লিচুর দাম আসছে প্রায় ৪ (চার) টাকা। এ বছর লিচুর দাম একটু বেশি হলেও মৌসুমি ফল হিসেবে বেশি দাম দিয়েই ছোটছোট লিচুগুলো কিনলাম।
তিনি আরো বলেন, লিচু আরো বেশি নেয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু লিচু টক ও তুলনামূলক আটির আকার বড়, রয়েছে পোকার আক্রমণও তাই বেশি কেনা হয়নি।
চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারে মাথাভাঙ্গা ব্রিজের মুখে লিচু বিক্রি করছিলেন ৪/৫ জন। আমাদের এই প্রতিনিধিকে (সাংবাদিক) দেখে শাকিব হাসান (২৪) নামে একজন লিচু বিক্রেতা বাদে। অন্যরা একে একে লিচু রেখে সরে পড়েন।
লিচু বিক্রেতা চুয়াডাঙ্গা শহরতলি দৌলতদিয়াড় গ্রামের রাজ আলীর ছেলে শাকিব হাসান জানান, রোদ-গরমের কারণে এবার লিচুর ফলন অনেক কম হয়েছে। সে কারণে এবার লিচুর সাইজ ছোট হলেও দাম একটু বেশি। লিচু প্রকারভেদে ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকায় (৮০টা লিচু) বিক্রি করছি। দাম বেশি ও আকারে ছোট হওয়ায় বিক্রি ভালো হচ্ছে না।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আতাউল হক জানান, হাইপোগ্লাইসিন সাধারণত কাঁচা বা আধা পাকা অর্থাৎ পাকা নয়, এমন লিচুতে পাওয়া যায়। এটি একটি অ্যামিনো অ্যাসিড, যা মারাত্মক বমি বমি ভাব সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মিথাইলিন-সাইক্লো-প্রোপাইল-গ্লাইসিন উপাদানটি গ্রহণের ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ দ্রুত কমে যায়। এর কারণে বমি, অচেতন এবং দুর্বল হয়ে পড়ে রোগী। কাঁচা বা আধা পাকা লিচু খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সচেতনতাও বাড়াতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা জানান, লিচুর গুণগত মান ঠিক রাখতে আর কয়েকদিন পরে লিচু বাজারজাত করলে ভালো হতো। পরিপক্ক হওয়ার আগে লিচু খেলে এতে পুষ্টি ঠিকঠাক পাওয়া যাবে না। ফলে লিচুর আসল স্বাদও পাওয়া যাবে না।
তিনি আরো বলেন, আমার মতে, লিচু পাড়ার নির্দিষ্ঠ কোনো সময় নেই বলে কৃষক ও ব্যবসায়ী দু-জনই সুযোগ নিয়ে অপরিপক্ক লিচু বিক্রি করছেন।