ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

কিশোর গ্যাং নেতার ‘টর্চার সেল’, যেখান থেকে আসতো কান্নার শব্দ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২২:০৩, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
কিশোর গ্যাং নেতার ‘টর্চার সেল’, যেখান থেকে আসতো কান্নার শব্দ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নির্মাণাধীন একটি ভবন। যার নিচতলায় চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। বাইরে দেয়ালে লাগানো রয়েছে রাজনৈতিক নেতার নামে পোস্টার। সেই পোস্টারের ঠিক পেছনে, অর্থাৎ টিন দিয়ে ঘেরা জায়গাটিই এলাকার লোকজনের কাছে পরিচিত ‘টর্চার সেল’ হিসেবে।

চট্টগ্রাম নগরের আকবরশাহ থানার পশ্চিম ফিরোজশাহ এলাকায় এ টর্চার সেলের অবস্থান। জানা গেছে, এটি গড়ে তুলেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রসুল নিশান। সম্প্রতি ঐ টর্চার সেলের পাশে হামলায় এক দন্ত চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটির পর বের হতে থাকে টর্চার সেলের জানা-অজানা নানা তথ্য।

গোলাম রসুল নিশান ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি। বর্তমানে পরিচয় দেন যুবলীগ নেতা হিসেবে। পশ্চিম ফিরোজশাহ এলাকায় তার বাড়ি। নগরের বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, মারামারির সাতটি মামলা রয়েছে নিশানের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ দন্ত চিকিৎসক হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়।

Advertisement

গত ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় পশ্চিম ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকায় মাদরাসাপড়ুয়া ছেলে আলী রেজাকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন ঐ এলাকার বাসিন্দা দন্ত চিকিৎসক কুরবান আলী। পশ্চিম ফিরোজশাহর নির্মাণাধীন সেই ভবনটি থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর হামলা চালায় ১৫ থেকে ২০ জন। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে চারদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল কুরবান আলী মারা যান।

কুরবান আলীর ছেলে আলী রেজা জানান, মাস দুয়েক আগে দুই স্কুলছাত্রকে মারধর করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। বিষয়টি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে জানানোয় তাদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় তার। এর জেরে ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাকে মারধর করতে দেখে ছুটে গিয়ে হামলার শিকার হন বাবা কুরবান আলী।

আলী রেজার ভাষ্য- হামলাকারীরা সবাই গোলাম রসুল নিশানের অনুসারী। এ ঘটনায় গোলাম রসুল নিশানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আকবরশাহ থানায় হত্যা মামলা করেন আলী রেজা।

এদিকে পুলিশ বলছে, চট্টগ্রাম নগরে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ২০০ কিশোর গ্যাং। যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি। এসব কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দিচ্ছেন কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন কথিত ‘বড় ভাই’। গত ছয় বছরে ৫৪৮টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে। ঘটেছে অন্তত ৩৪টি খুনের ঘটনাও।

নানা সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এসব কিশোররা ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যান কথিত বড় ভাইরা। ফলে বড় ভাইদের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন- এলাকায় চাঁদাবাজি, সরকারি দফতরগুলোতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল কিংবা কোণঠাসা করাসহ বিভিন্ন কাজে কিশোরদের ব্যবহার করছেন কথিত বড় ভাইরা। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণও প্রায় অসম্ভব।

কথার অবাধ্য হলে সোজা ‘টর্চার সেল’

নগরের একেখান মোড় থেকে জিইসির মোড়ের দিকে যেতে ইস্পাহানি রেলগেটের আগে পশ্চিম ফিরোজশাহ এলাকায় রাস্তার পাশে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি ১০ তলা ফ্ল্যাট প্রকল্প নির্মাণাধীন। ২০১৮ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেই ভবনের নিচতলাটি স্থানীয়দের কাছে ‘নিশান গ্রুপের টর্চার সেল’ হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয়রা জানান, এলাকায় কেউ গোলাম রসুল নিশানের কথার অবাধ্য হলে তাকে টর্চার সেলটিতে নিয়ে চালানো হতো নির্যাতন। সেই নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি স্কুল শিক্ষার্থীও। শুধু তাই নয়, স্কুলপড়ুয়াদের অনেকেও জড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাংয়ে। কাউকে বাধ্য করে, কেউ আবার জড়াচ্ছে সঙ্গ দোষে; নিজের বীরত্ব দেখাতে।

টর্চার সেলে গোলাম রসুল নিশানের নির্দেশে নির্যাতন চালাতেন এমন কয়েকজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- স্থানীয় সামির, রিয়াদ, সোহেল ওরফে বগা সোহেল, আকিব, অপূর্ব, রাজু, সাগর, বাবু, সংগ্রাম, সাফায়েত ও আকবর। কিশোর গ্যাং বলা হলেও তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে। চিকিৎসক কুরবান আলী হত্যা মামলায়ও আসামি করা হয়েছে সবাইকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পশ্চিম ফিরোজশাহ এলাকার একজন বলেন, বিভিন্ন সময় অনেককে ধরে নিয়ে আসা হতো টর্চার সেলটিতে। আনার কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। পরে আবার ছেড়ে দিত।

চাঁদার টাকা না পেয়ে মাসখানেক আগে ভাসমান এক দোকানদারকে টর্চার সেলে নিয়ে মারধর করা হয়- এমন অভিযোগও করেন স্থানীয়দের অনেকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনে ইট, বালুসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করেন নিশান গ্রুপের সদস্যরা। বেশি দাম দিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী কিনতে বাধ্য করা হয় তাদের কাছ থেকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দোকান থেকে মাসিক চাঁদা ও পরিবহন থেকে চাঁদা আদায় করে থাকেন তারা।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর আকবরশাহ থানার কৈবল্যধাম এলাকায় সাউন্ড বক্সে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে খুন হন জুট মিলের কর্মচারী জয় দাশ। ঐ ঘটনায় ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। সেই ১০ আসামির সবাই গোলাম রসুল নিশানের অনুসারী বলে জানা যায়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিশান গ্রুপের উত্থান ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। তখন স্থানীয় একটি ক্লাব থেকে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা হতো। পরে গণপূর্তের ভবনের নিচতলায় আস্তানা গড়ে তোলা হয়।

পশ্চিম ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকা সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে করিম বলেন, কিশোর গ্যাং নেতা গোলাম রসুল নিশানের সঙ্গে স্থানীয় ২০ থেকে ৩০ জন রয়েছেন। বহিরাগত আরো ৫০ থেকে ৬০ জন নিয়মিত এলাকায় আসতেন। মোটরসাইকেল দিয়ে শোডাউন দিতেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে আমাকেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসক খুনের ঘটনার পর থেকে এলাকায় নেই গোলাম রসুল নিশান। তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

এ বিষয়ে আকবরশাহ থানার ওসি গোলাম রব্বানী বলেন, চিকিৎসক খুন ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এলাকায় টহলও বাড়ানো হয়েছে।

টর্চার সেল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে- টর্চার সেলে নিয়ে মারধর-নির্যাতনের বিষয়ে কখনো কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করেননি বলে জানান ওসি।

আরো ছয় কিশোর গ্রুপ

পুলিশের তথ্য বলছে, নিশান গ্রুপ ছাড়াও আকবরশাহ থানা এলাকায় রয়েছে কিশোর অপরাধীদের আরো অন্তত ছয়টি গ্রুপ। এসবের পৃষ্টপোষক হিসেবে রয়েছে বেলাল উদ্দিন ওরফে জুয়েল, সাগর ওরফে লাল সাগর, মনোয়ারুল আলম ওরফে নোবেল, মোহাম্মদ সোহেল ওরফে ঝোলা সোহেল, মোহাম্মদ মানিক ওরফে লাল মানিক এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিমের নাম। তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে এলাকায় চাঁদাবাজি, জায়গা দখলসহ নানা অভিযোগ। যদিও নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম।

চলতি বছরের শুরুতে নগর পুলিশের করা এক জরিপে উঠে আসে, নগরে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রদের অনেকে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অভিভাবকদের অগোচরে এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই’দের প্ররোচনায় জড়াচ্ছে অপরাধে। শুরুতে তারা হিরোইজম (বীরত্ব) দেখানোর জন্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। পরে তা থেকে বের হতে পারে না।

মঙ্গলবার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে নিরীহ মানুষ, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক থেকে শুরু করে কেউ রক্ষা পাচ্ছেন না। শুধু কিশোর গ্যাং নয়, তাদের গডফাদারদেরও (মদদদাতা) আইনের আওতায় আনা হবে।

কিশোর গ্যাং রোধে অভিভাবক ও এলাকাবাসীকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায়।

তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণকারী ‘বড় ভাইয়েরা’ যত বড় শক্তিশালী হোন না কেন, পুলিশ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। অভিভাবক ও এলাকাবাসী তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করলে আরো দ্রুত এসব নির্মূল করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, বর্তমান সময়ে কিশোর গ্যাং একটি বড় সমস্যা। এটি সমাজের বিষফোঁড়ার মতো। উঠতি বয়সী কিশোরদের মধ্যে একধরনের হিরোইজম কাজ করে, সেটিকে পুঁজি করে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করে একটি মহল। আর নিজেরা থেকে যায় আড়ালে। দিনশেষে বড় থেকে আরো বড় অপরাধী হয়ে ওঠে একজন কিশোর।

তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একার পক্ষে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোরদের কল্যাণকর কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাহলেই খুব সহজে এই সমস্যার সমাধান হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: চট্টগ্রাম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!