এর মধ্যেই মাটিকাটা ভেকু নিয়ে এসে উপজেলা চত্বরে আটকে রাখা, ভেকুর ব্যাটারি জব্দ করাসহ মাটিকাটার ভেকু পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নাটোরে সাতটি উপজেলায় এখন পুকুর খননের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় তিন-চার ফসলি জমির মাটি কেটে চলছে পুকুর খনন।
এদিকে, সম্প্রতি নাটোরে নলডাঙ্গা উপজেলা তেলকুপি এলাকায় রাতের আঁধারে অবৈধভাবে পুকুর খননের সময় মাটিকাটা ভেকু পুকুর খনন অবস্থায় আটক করে উপজেলা চত্বরে নিয়ে এসে রাখেন নলডাঙ্গার ইউএনও দেওয়ান আকরামুল হক। এর আগে, ঐ জায়গায় অবৈধভাবে পুকুর খননের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাকিবুল হাসান। আবার সদর উপজেলার পাইকোরদল এলাকায় অবৈধভাবে পুকুর খননের সময় আগুন দিয়ে ভেকু পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি রাতের আঁধারে পুকুরে থাকা ভেকুটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
.png)
স্থানীয়রা জানান, নাটোর সদর পাইকোদল উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে একরামুল ইসলাম তার জমিতে গত কয়েক দিন ধরে প্রতি রাতে পুকুর খনন করছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কয়েকজন মিলে রাতে মাটিকাটার মেশিনে আগুন লাগিয়ে দেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
নাটোর সদর উপজেলার কোরটা, গাজীরবিল, লক্ষ্মীপুর, খোলাবাড়িয়া, ভাতুরিয়া, ছাতনী, বাকশোর, পাইকোরদৌল, বলদখালসহ বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, ফসলি জমিতে চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে একের পর এক পুকুর। পুকুরের পাশে পতিত পড়ে আছে অনেকের অনাবাদি জমি। অনেক জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। তিন ফসলি জমি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এলাকার অনেক কৃষক। এরই মধ্যে আবার নতুন করে চার ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এমন চিত্র শুধু নাটোর সদর নয়, সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, বাগাতিপাড়া এবং নলডাঙ্গা উপজেলায়ও।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপ-পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ২০১০-১১ মৌসুমে নাটোর জেলায় মোট আবাদি জমি ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৮ হেক্টর। এ বছর তা কমে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এসব আবাদি জমিতেই পুকুর খনন করা হয়েছে। সাময়িক বেশি লাভের আশায় কৃষকরা ফসল উৎপাদন না করে মাছ চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
নাটোর জেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিন কিংবা চার ফসলি জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষ কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। এক ফসলি বা অনাবাদি জমিতে পুকুর করে মাছ চাষের বিষয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তিন কিংবা চার ফসলি জমিতে পুকুর খননে নিবৃত্ত করতে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে আসছে মৎস্য বিভাগ।
পাঁচ বছর আগে ২০১৯ সালে ঢাকার ‘লইয়ারস সোসাইটি ফর ল’ নামের মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষে এর মহাসচিব মেজবাহুল ইসলাম আতিক নাটোরের পাঁচ উপজেলা- নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া, বাগাতিপাড়া ও গুরুদাসপুরে আবাদি জমিতে জনস্বার্থে পুকুর খনন বন্ধের আদেশ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন।
শুনানি শেষে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মাদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ঐ বছরের ১২ মে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, নাটোরের জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, সংশ্লিষ্ট পাঁচটি উপজেলায় কৃষি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে তদারকি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন। তবুও বন্ধ হয়নি আবাদি জমিতে পুকুর খনন।
এ ব্যাপারে নাটোর জেলা প্রশাসক আবু নাছের ভূঁইয়া বলেন, জেলার প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারা আবাদি জমি রক্ষায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। পুকুর খনন বন্ধ করতে আর্থিক দণ্ডসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।