জেলার নড়িয়া উপজেলার বিঝারি ইউনিয়নের কাপাশপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা তার বিদায়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেন। কাপাশপাড়া বাইতুল নুর জামে মসজিদের সামনে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে শুক্রবার বাদ জুমা ওয়াজউদ্দিন শেখকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রথমে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা দেওয়া হয়।
এ সময় তার হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ এক লাখ টাকা এবং নানা উপহারসামগ্রী। পরে বিভিন্ন রঙের বেলুনে সাজানো সুসজ্জিত একটি ঘোড়ার গাড়িতে উঠিয়ে ওয়াজউদ্দিন শেখকে শতাধিক মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাড়ি পৌঁছে দেন গ্রামের যুবকরা।
.png)
হাফেজ ওয়াজউদ্দিন শেখ উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের উপসী গ্রামের রমিজ উদ্দিন শেখের ছেলে। তার ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন।
গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাফেজ ওয়াজউদ্দিন শেখ দীর্ঘ ৩৫ বছর ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যখন কাপাশপাড়া বাইতুল নুর জামে মসজিদে ইমামতি শুরু করেন তখন মসজিদটি ছিল ছোট একটি টিনের ছাউনির। গ্রামবাসী তখন তাকে বছরে ২২ মণ ধান দিতেন। পরে মাসে অল্প বেতনে তিনি ইমামতি চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ইমামতি শেষে বার্ধক্যজনিত কারণে আজ তিনি অবসর নিলেন।
গ্রামবাসী তাকে না জানিয়েই বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি নেন। তাঁরা চেয়েছিলেন এমন একজন মহৎ ব্যক্তির বিদায় অনুষ্ঠান যেন স্মরণীয় হয়ে থাকে। তাই তারা ঘোড়ার গাড়ি বিভিন্ন রঙের বেলুন দিয়ে সাজিয়ে রাখেন। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইমাম সাহেবকে পোশাক, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এদিন মসজিদে দাঁড়িয়ে এলাকার নানা বয়সী মানুষ স্মৃতিচারণা করেন। পরে বিদায় সংবর্ধনা শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। এ সময় তাকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে গ্রামের যুবসমাজ মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসেন।
স্থানীয় আল-আমিন ওঝা, মুয়াজ্জেম চৌকিদার, সোহাগ চৌকিদার ও শরীফ সরদার বলেন, ইমাম সাহেব খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তার বিদায়ে আমাদের চোখে পানি এসে গেছে। আমরা এলাকাবাসী তাকে যেমন ভালোবেসেছি, তেমনি তিনিও আমাদের ভালোবাসতেন। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।
মসজিদের কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মান্নান চৌকিদার বলেন, হাফেজ ওয়াজউদ্দিন শেখ দীর্ঘ ৩৫ বছর ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। যখন তিনি মসজিদে ইমামতি শুরু করেন তখন মসজিদটি ছিল ছোট একটি টিনের ছাউনির। তখন আমরা তাকে বছরে ২২ মণ ধান দিতাম। পরে মাসে অল্প বেতন রিতে শুরু করি। আজ তার কারণেই মসজিদটিতে টাইলস ও দোতলা করা হয়েছে। তিনি একজন সাদা মনের মানুষ। একই মসজিদে এত বছর তিনি ইমামতি করছেন, অথচ কারও সঙ্গে তার কোনো মনোমালিন্য হয়নি। তিনি বয়সের ভারে ইমামতি ছাড়তে চাইলেও গ্রামবাসী তাকে এত দিন ছাড়েননি।
মসজিদ কমিটির সভাপতি রাশেদুজ্জামান চপল খান বলেন, আজকের দিনটি আমাদের জন্য বেদনার। কেননা আমরা আমাদের আত্মার আত্মীয়কে বিদায় দিলাম। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর আমাদেরকে দ্বিনি শিক্ষায় আলোকিত করেছে। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাকে সুস্থ রাখুন, ভালো রাখুন- এটাই আমাদের কামনা।
হাফেজ ওয়াজউদ্দিন শেখ আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমি যখন এখানে আসি মসজিদটিতে জানালার কপাট ছাড়া ছোট একটি টিনের ঘর ছিল। আমি সামান্য একটি মাদুর বিছিয়ে থাকতাম। উঁই পোকায় বিছানা খেয়ে ফেলতো। তবে আমার একটাই চিন্তা ছিল কীভাবে এলাকার মুসল্লিদের নিয়ে মসজিদটিকে সুন্দর করা যায়। ধীরে ধীরে সবাইকে নিয়ে কাজ শুরু করি। বর্তমানে মসজিদটি দোতলা ও টাইলস হয়েছে। আমার বয়স হয়ে যাওয়ায় আজ এই মসজিদ ছেড়ে বিদায় নিতে হচ্ছে। কিন্তু আমার মন চাইছে না বিদায় নিতে। এলাকার সবাই আমাকে অনেক সম্মান দেখিয়েছেন। আল্লাহ তাদের সবাইকে ভালো রাখুন।
বিঝারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ কাজী বলেন, একজন ইমাম সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তার এমন সম্মান ও রাজকীয়ভাবে বিদায় দিয়ে খুবই প্রশংসনীয় কাজ করেছেন এলাকাবাসী।