জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিঘার পর বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ দেখা গেছে। মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য। ফুলে মধু আহরণে ভিড় করছে মৌমাছি। তবে অনেক জমিতেই বীজ দেখা গেছে। বীজগুলো বেশ তরতাজা, যা ভালো ফলনের সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে।
এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত মৌসুম থেকে ১৩৭ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এবং লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রতিদিন সকাল-বিকেল আশপাশ এলাকা থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা দলবেঁধে আসেন সরিষা ফুল দেখতে। অনেকেই সরিষা ক্ষেতে ঢুকে শখ করে ছবি তোলেন। কেউ সেলফিতে ব্যস্ত কেউবা পরিবারের ছবি তুলতে ব্যস্ত। কেউ ঘুরে ঘুরে সরিষা ক্ষেত দেখেন।
.png)
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ২০ হাজার ৩৯২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয়েছে ১৫ হাজার ৬৬৮ হেক্টর জমিতে। তবে গত মৌসুম থেকে চলতি মৌসুমে ১৩৭ হেক্টর জমিতে বেশি সরিষার চাষ করা হয়েছে। এ মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ২৮৫ হেক্টর, নবীনগর উপজেলায় চার হাজার ৫০ হেক্টর, সরাইল উপজেলায় এক হাজার ৯২ হেক্টর, নাসিরনগর উপজেলায় ছয় হাজার ৫০ হেক্টর, আশুগঞ্জ উপজেলায় এক হাজার ১২০ হেক্টর, বাঞ্চারামপুর উপজেলায় এক হাজার ৮৫০ হেক্টর, বিজয়নগর উপজেলায় ৫১০ হেক্টর, কসবা উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর এবং আখাউড়া উপজেলায় ৪৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, টরি-৭ জাতের সরিষার চাষ করেছেন।
সরজমিনে সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের সুতিয়ারা, সুহিলপুর ইউনিয়নের সুহিলপুর, মাছিহাতা ইউনিয়নের গাজারিয়া গ্রাম এবং নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নের কালিসীমা গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় হলুদের সমারোহ। দিগন্ত জোড়া ফসলি মাঠ হলুদ ফুলে ফুলে শোভিত। বাতাসে দোল খাচ্ছে সরিষার ফুল। প্রতিটি সরিষার জমিতে মৌমাছির গুঞ্জন। সরিষার হলুদ ফুলের হাসিতে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, বারি-১৪, ১৭, ১৮ সহ অন্যান্য সরিষা বপনের পর ৮৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। সরিষা উত্তোলন করে ফের একই জমিতে বোরো আবাদ করা যায়। সরিষা গাছের পাতা মাটিতে পড়ে জৈব সারে পরিণত হয়। এতে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। সরিষার উৎপাদন ব্যয়ও কম। এ চাষের পর একই জমিতে ধান চাষ করলে সার কম দিতে হয়। তাই এখানকার কৃষকরা বর্তমানে সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগে তারা স্থানীয় টরি সেভেন, টিএস সেভেন্টি টু, এসএস সেভেন্টি ফাইভ জাতের সরিষা চাষ করতেন। চলতি মৌসুমে তারা অধিক ফলনশীল বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। এই জাতের সরিষা ৮৫ থেকে ৯০ দিনে ঘরে তোলা যায়। ফলন হয় বেশি। সরিষা তোলার পর ঐ জমিতে আবার ইরি আবাদ করা যায়।
মাছিহাতা ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সরিষা ক্ষেতে ছবি তুলতে দেখা যায় দর্শনার্থীদের। সুস্মিতা সাহা নামে এক তরুণী বলেন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। পাশে সরিষা ক্ষেত দেখে খুব ভালো লাগলো। সেই ভালো লাগা থেকে গাড়ি থামিয়ে সরিষা ক্ষেতে ছবি তুলতে শুরু করেছি।
রাজব মিয়া নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, পরিবার পরিজন নিয়ে চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকি। কিছুদিন যাবত সরিষা ক্ষেতের কথা অনেকের মুখে শুনে এবং ফেসবুকে ছবি দেখে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছবি তুলতে এসেছি। সরিষা ক্ষেতে ঘুরে এবং ছবি তুলে ভালো লেগেছে।
সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রামের কৃষক রজব মিয়া জানান, তিনি পাঁচ বছর ধরে তিন বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করে আসছেন। চলতি বছর তিনি বারি-১৪ জাতের সরিষার আবাদ করছেন। এতে বিঘা প্রতি চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জমিতে সরিষার গাছগুলো বেশ ভালো হয়েছে। তিনি আশা করছেন এ বছর সরিষার বাম্পার ফলন হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মুন্সি তোফায়েল আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার ৩৯২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষ হয়েছে ১৫ হাজার ৬৬৮ হেক্টর জমিতে। তবে গত মৌসুম থেকে চলতি মৌসুমে ১৩৭ হেক্টর জমিতে বেশি সরিষার চাষ করা হয়েছে। এ বছর জেলায় সরিষার ভালো ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।