দূর-দূরান্ত থেকে জানাজায় অংশ নিতে ছুটে আসেন হাজারও মানুষ। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে আঁখি ও তার নবজাতকের মরদেহ দাফন করা হয়।
গাইনের ডহর গ্রামের পাশের গ্রাম কৃষ্ণপুরের বাসিন্দা মোর্শেদুল আলম জানান, পাশের গুনতি, কইয়ারপাড়, তালতলা, দিঘিরপাড়, নরপাটি, উত্তরকূল ও আজগরাসহ প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ আঁখিদের বাড়িতে আসে। চঞ্চল মেয়েটার এভাবে চলে যাওয়া যেন কেউই মানতে পারছে না। লাশ নিয়ে গ্রামে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে যেন গ্রামে জুড়ে একটা শোকের আবহ সৃষ্টি হয়। সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। আঁখির মা অচেতন হয়ে পড়েন। স্বজনরা তাকে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
.png)
নিহত আঁখির চাচাতো ভাই মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, এক গাড়িতে বোন (আঁখি) আর ভাগিনা ইরহাম আবদুল্লাহ আরাফের লাশ এনেছি। মৃত অবস্থাতেই তার নাম রেখেছি আমরা। জানাজা শেষ। বোনকে শেষ বিদায় দিয়েছি। তার স্মৃতি কী করে ভুলবো?
এর আগে সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে আঁখি এবং তার নবজাতকের মরদেহ নিয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হন স্বজনরা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে আঁখির বাবার বাড়ি লাকসামের গাইনের ডেয়রা গ্রামে পৌঁছান তারা।
প্রসঙ্গত, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের পর মা মাহমুদা রহমান আঁখি রোববার (১৮ জুন) দুপুর ২টার দিকে ল্যাবএইড হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকাবস্থায় মারা যান।
এর আগে সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সংযুক্তা সাহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নরমাল ডেলিভারির তথ্য পেয়ে গত ৯ জুন কুমিল্লা থেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আসেন আঁখি। কিন্তু সেদিন ডা. সংযুক্তা সাহার বদলে ওই নারীর ডেলিভারি করতে যান ডা. মিলি।
এ সময় ডা. মিলি ওই প্রসূতির পেট কাটতে গিয়ে মূত্রনালি ও মলদ্বার কেটে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অজ্ঞান অবস্থায় সিজার করে বাচ্চা বের করা হয়। এতে বাচ্চার হার্টবিট কমে গেলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তির পর সেখানে আঁখিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। তবে তার কোনো ইমপ্রুভমেন্ট ছিল না। চিকিৎসকরাও জানিয়েছিলেন, আঁখির ইমপ্রুভমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার শরীরের কিডনি, লিভার, হার্ট এবং অন্য কোনো অংশ কাজ করছিল না। এরমধ্যে ব্রেন স্ট্রোকও করেন আঁখি, সেই সঙ্গে রক্তক্ষরণও বন্ধ হচ্ছিল না তার। ফলে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ার কারণে শরীরের অন্য অংশগুলো কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে পড়েছিল। এতে হাসপাতালে ভর্তির পুরো সময় তাকে রক্ত দিতে হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিশ্বাস চলবে ততক্ষণ পর্যন্ত রক্ত দিতে হবে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।
গত বুধবার (১৪ জুন) এজাহারনামীয় দুই আসামি ডা. মুনা সাহা ও ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানাকে গ্রেফতার করেছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। সেন্ট্রাল হাসপাতালের এ ঘটনায় চিকিৎসক ও নার্সসহ ১১ জনকে বরখাস্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় গত শুক্রবার সেন্ট্রাল হাসপাতালে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। অভিযানে হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ঘাটতি দেখতে পান অধিদফতরের কর্মকর্তারা। জরুরি চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আইসিইউসহ প্রতিষ্ঠানটিতে সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দেয় অধিদফতর। পাশাপাশি ডা. সংযুক্তা সাহাকে ওই প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ সেবা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।