টগবগে যুবক অবস্থায় ট্রাক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। সেসময়ই সুখের আসায় বিয়ে করেন। সুস্থ সবল অবস্থায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করা টাকা দিয়ে সুখের সংসার হয়েছিল তার। কিন্তু এক ট্রেন দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় তার দুটি পা। ফলে বাধ্য হয়েই দুই পা কেটে দেন চিকিৎসক। ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাসে সুখের সংসার এক নিমেষেই দুঃখের সাগরে ভেসে যায়।
দুই পা হারানো শামীম নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের বর্তমান সময়টুকু পাড়ি দিচ্ছেন। পেটে দুমুঠো ভাত দিতে মানুষের সামনে গিয়ে গান গাইছেন। এতে খুশি হয়ে যে যা দিচ্ছেন তা দিয়েই কোনোরকমে খেয়ে-পড়ে বেঁচে আছেন।
.png)
সম্প্রতি শহরের জয়নুল আবেদীন পার্কে হাতে একতারা নিয়ে গান গাইতে দেখা যায় শামীমকে। আশপাশে থাকা লোকজন তার গান শুনছিলেন মনোযোগ দিয়ে। আবার অনেকে গান ভিডিও করছিলেন মোবাইলে।
এ সময় কথা হয় শামীমের সঙ্গে। তিনি জানান, যৌবনকালে ট্রাকচালক ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালের শুরুতে বিয়ে করেন। বিয়ের পরের বছরই তার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দিনগুলো ছিল মধুর। কিন্তু কপালে সুখ সইলো না বেশি দিন। ২০০০ সালের জুলাইয়ে স্ত্রীসহ তিন মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে নিজের বাসা থেকে শ্বশুরবাড়ি সদরের সুতিয়াখালী এলাকায় যাবেন তিনি। এ জন্য রেলস্টেশনে গিয়ে ট্রেনে ওঠেন তারা। ঐদিন সুতিয়াখালী স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার সময় হঠাৎ পা পিছলে উল্টে পড়ে যান শামীম।
এ সময় ট্রেনের চাপায় দুই পা থেঁতলে গিয়ে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। এমতাবস্থায় স্ত্রীসহ আশপাশের লোকজন তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জীবন বাঁচানোর স্বার্থে দুইটি পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলে দেন চিকিৎসক। পা কাটার কয়েকদিন পরই শামীমকে ছেড়ে তিন মাস বয়সী কোলের সন্তানকে নিয়ে চলে যান স্ত্রী। বিয়ে করেন অন্য একজন সুস্থ পুরুষকে। এদিকে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন শামীম। মায়ের সেবায় আর নিজের মনোবলে একপর্যায়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে যান তিনি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ঘটনার দুই বছরের মধ্যে আমি আবারো বিয়ে করি। কিন্তু আমার পা না থাকায় প্রতিবন্ধী এক নারীকে বিয়ে করতে হয়েছিল। এ সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। কিন্তু দুই পা ছাড়া কাজ করে ঠিকমতো সংসার চালাতে পারিনি। ফলে ধীরে ধীরে এ সংসারেও ভাঙন ধরে এবং ২০২০ সালে দ্বিতীয় স্ত্রী ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যান।
শামীম আরো বলেন, এখন ঘরে পড়ে থাকা বৃদ্ধ মা ছাড়া কেউ নেই আমার৷ একটি প্রতিবন্ধীর কার্ড পেয়েছি। কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বেশ কয়েকটি কষ্টের গান শিখেছি। একতারা নিয়ে এসব গান গেয়ে শহরের বিভিন্ন পার্কে গান গাই। এতে অনেকে খুশি হয়ে টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। এ টাকা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলছে।
শামীমের গান শোনার পরে কথা হয় আনোয়ার হোসেন নামে একজন দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, পার্কে প্রতিবন্ধী শামীম মনের মাধুর্য মিশিয়ে গান গায়। তাই অনেকে গান শুনতে ছুটে আসেন। পরে যে যার মতো টাকা দিয়ে সহায়তা করে।
জামাল উদ্দিন নামে আরেকজন বলেন, শামীমের দুইটি পা নেই বলে অনেক মায়া লেগেছিল। তাই গান শুনে তাকে কিছু টাকা সহায়তা করেছি। সবারই উচিৎ অসহায় মানুষের সহায়তা করা।