ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

মানিকগঞ্জের কৃষিজমি মাটি খেকোদের কবলে

আসাদ জামান, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৫১, ১৭ মে ২০২৩
মানিকগঞ্জের কৃষিজমি মাটি খেকোদের কবলে
ভেকু দিয়ে কাটা হচ্ছে মাটি -ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মানিকগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় চলছে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার মহোৎসব। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল। খননযন্ত্র দিয়ে কাটা এসব জমির উর্বর মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটাসহ নানা জায়গায়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রশাসন কয়েকজনকে জরিমানা করলেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এমতাবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয়রা।

মানিকগঞ্জের চান্দর, জার্মিত্তা, চারিগ্রাম, খোলাপাড়া, বলধারা, মানিকদহ, গোলাইডাঙ্গা, জামশা, বায়রা, তিল্লী, ধামশ্বর, উকিয়ারা, পুটাইল, আটিগ্রাম, বানিয়াজুরি, বেতিলা, মিতরা, পালড়া, নবগ্রাম, ভাড়ারিয়া, বাইচাইল, মহাদেবপুর, শিমুলিয়া, কুসুন্ডা এলাকাসহ অন্তত শতাধিক স্পটে এমন মাটি কাটা চলছে। প্রশাসনের ভয়ে কেউ রাতের আঁধারে মাটি কাটলেও বেশিরভাগ জায়গায় দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে কেটে নেয়া হচ্ছে। এসব জায়গা থেকে ফসলি জমির মাটি কেটে নেয়ায় বর্ষার মৌসুমে পাশের জমি ভেঙে পড়ায় শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এভাবে কৃষিজমি থেকে মাটিকাটা অব্যাহত থাকলে হুমকিতে পড়বে মানিকগঞ্জের কৃষিখাত।

কৃষিবিদরা বলছেন, ফলনযোগ্য জমির উৎপাদন শক্তি জমা থাকে মাটির ৬-১৮ ইঞ্চি গভীরতায়। এটাই টপ সয়েল বা প্রাণমাটি বলে পরিচিত। এই অংশ একবার কেটে নিলে জমিতে মৃত্তিকা প্রাণ থাকে না। জমি পঙ্গু হয়ে যায়। একবার এই টপ সয়েল কেটে নিলে সেই রুপে ফিরতে সময় লাগে প্রায় ১০০-৫০০ বছর।

Advertisement

সিংগাইরের বায়রা গ্রামের বিদেশ ফেরত জাহিদুর রহমান বলেন, ‘আমার জমির পাশের দুই ফসলি জমি এমনভাবে কাটা হয়েছে, বর্ষার পানি আসলেই আমার ক্ষেতের এক অংশ ভেঙে পড়বে। এতে করে আমাকেও এক সময় বাধ্য হয়ে মাটি খেকোদের কাছে জমির মাটি বিক্রি করতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে ফসলি জমি সব শেষ হয়ে যাবে।’

মাটি কাটায় পাড় ভেঙে পড়ছেসিংগাইরের শিবপুর গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন মাটি কাটা বন্ধ থাকে। ১০-১৫ দিন পর থেকে আবার ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত মাটি কাটা শুরু হয়েছে। পাশে আমার জমি হওয়ায় জমির পাড় অনেকটা ভেঙে গেছে। ধান চাষের জন্য জমিতে সেচের পানি দিলে তা আটকে রাখা যাচ্ছে না। জমিতে ফসল কেমন ফলবে তাও জানিনা। প্রশাসন চাইলে ১ ইঞ্চি মাটি কাটার সাধ্য কারো নাই।’

অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ‘কৃষিজমি থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটিকাটার সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকে বলে আমরা বিভিন্ন সময় দেখতে পাই। রক্ষক যখন ভক্ষকের দায়িত্ব পালন করে তখন কিছুই করার থাকে না। আর মাটি আনা নেয়ার সময় রাস্তায় মাটি পড়ায় বৃষ্টির সময় রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে যেকোন সময় বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কঠোর থেকে কঠোর ভূমিকা পালন ছাড়া উত্তোরণের কোনো পথ নেই।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘মানিকগঞ্জে ফসলের নিবিড়তা ২৫০ শতাংশ। একটা জমি থেকে বছরে গড়ে আড়াইটা ফসল পান কৃষকরা। কোনো কোনো জায়গায় চার ফসলি জমিও রয়েছে। মানিকগঞ্জে প্রায় শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। এ মৌসুমে সেসব ভাটায় মাটির চাহিদা থাকায় এক শ্রেণির মাটি ব্যবসায়ীরা অধিক লোভ কিংবা চাপ দিয়ে এমন কাজ করে থাকেন। এমন মাটি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন কমে যাবে এবং বড় ধরণের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’

মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল কেটে নিচ্ছে অথবা অবৈধভাবে বালি কিংবা মাটি উত্তোলন করছে। সেক্ষেত্রে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের জরিমানা করছেন।’

তিনি আরো বলেন, কখনো কখনো অনেক রাতে মাটি কাটায় তাৎক্ষণিকভাবে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। মোবাইল কোর্টের একটা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তা হলো তাৎক্ষণিক যদি আমরা অপরাধীকে স্পটে না পাই সেক্ষেত্রে আমরা তার বিচার করতে পারি না। এ ব্যাপারে কৃষিজমিকে যতটুকু রক্ষা করা যায় সেই মর্মে আমাদের উপজেলা ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেওয়া আছে। তাছাড়া অবাধে মাটি কাটা বন্ধে এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তরা সচেতন হলে এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
ট্যাগ: মানিকগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!