ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বে ক্যাম্পে আগুন দেয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:০৮, ১৫ মে ২০২৩
আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বে ক্যাম্পে আগুন দেয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা
রোহিঙ্গা ক্যাম্প- ফাইল ফটো

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলেছে। হত্যা, অপহরণ, পাচার ও মাদক কারবারের সঙ্গে ক্যাম্পে একের পর এক অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটছে। বিভিন্ন গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

কক্সবাজার পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, রোহিঙ্গা মাঝি ও সাধারণ রোহিঙ্গা, প্রশাসনের সদস্য, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এসব কথা জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তার কাজ তদারকি করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। ৮-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক আমির জাফর জানিয়েছেন, ক্যাম্পে অনেক গ্রুপ রয়েছে। তারা একে অন্যকে হটিয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। কারণ, ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে থাকবে, মাদক ব্যবসা, পাচার, অপহরণসহ সব কিছু তারা করতে পারবে। বেশিরভাগ সহিংসতার ঘটনা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে। 

Advertisement

চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে ১০টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয়। তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

রোহিঙ্গা সূত্রগুলো জানিয়েছে, এদের মধ্যে বড় সন্ত্রাসী সংগঠন হলো আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) আর রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। এর বাইরে নবী হোসেন গ্রুপ, মুন্না গ্রুপ, ডাকাত হাকিম গ্রুপ, ডাকাত সালেহ গ্রুপ, ইসলামিক মাহাস গ্রুপসহ নানা গ্রুপ রয়েছে। আরসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আল-ইয়াকিন নামেও পরিচিত।

আরএসও আগে থেকেই কুতুপালং ক্যাম্পে সক্রিয় ছিল। ২০১৭ সালের পর থেকেই আরসা এবং অন্য সংগঠনগুলো আরো বেশি সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সূত্রগুলো আরো বলছে, এসব গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি- এসব নিয়েই এখন বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। আরসা এবং আরএসও আলাদাভাবে কাজ করলেও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল না। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই দুটি সংগঠন পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে আরসার বিরুদ্ধে আরএসও গত দুই বছরে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

কর্মহীন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এই রোহিঙ্গাদের ঘিরে মাদক, পাচার, অপহরণসহ নানারকম অপরাধের সাম্রাজ্য তৈরি করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। মাদক পাচার, অপহরণ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব হলেই তারা একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। নিজেদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছে। যখন তারা সেই প্রভাব আরো বিস্তারের চেষ্টা করে, তখন আরেকটি গ্রুপের সঙ্গে গোলাগুলি বা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে যায়।

রোহিঙ্গা মাঝিরা বলছেন, ক্যাম্পের সব জায়গায় এসব দলের লোকজন ছড়িয়ে রয়েছে। ক্যাম্পে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় টাকা-পয়সা আর শক্তি দেখানোর লোভে অনেক রোহিঙ্গা তরুণ এসব গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। নিজেদের কৌশলও পরিবর্তন করেছে এসব সন্ত্রাসীরা। এখন আগের মতো তারা দলবেঁধে অস্ত্র হাতে ক্যাম্পে চলাফেরা করে না। কাউকে টার্গেট করা হলে সুবিধামতো সময়ে তারা হামলা করে।

কোনো সশস্ত্র গ্রুপ একটি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর আরেকটি গ্রুপ এসে পাল্টা হামলা করে সেই এলাকার দখল নেয়ার চেষ্টা করে। ফলে আরসা সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা করছে আরএসও, আবার আরএসও সদস্যদের ওপর পাল্টা হামলা চালাচ্ছে আরসা। এসব কারণে গত দুই বছরে ৪০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা জানান, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বে বেশ কয়েকবার ক্যাম্পে আগুন দেওয়া হয়েছে। এক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় আরেক গ্রুপ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

আগে আরসার লোকজন নাইক্ষ্যংছড়ির শূন্য রেখায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছিল। শূন্য রেখা থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে দেওয়ার পর তারা অন্য ক্যাম্পগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অর্থের মূল উৎস মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচারের ব্যবসা। মিয়ানমারের ইয়াবা তৈরিকারিদের সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের কাছ থেকে সীমান্তের পাহাড়ি এলাকা, নদী থেকে ইয়াবা বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরে এই চক্রের কাছ থেকে সেটা বাংলাদেশি মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়া মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে যেসব পণ্য পাচার হয়ে দেশে আসে, সেটাও নিয়ন্ত্রণ করে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী। সেই সঙ্গে রয়েছে ক্যাম্প থেকে মানবপাচার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করার মতো অপরাধ। যে এলাকা যাদের নিয়ন্ত্রণে, সেই এলাকার দোকান-ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা চাঁদা আদায় করে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাবে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আড়াই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার, মাদক কারবার, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ, মানবপাচার ও পুলিশের ওপর হামলার মতো অভিযোগ রয়েছে।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-১৪ এর কমান্ডার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাম্প্রতিক যেসব গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, প্রায় তার সবই আরসা ও আরএসও সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। তবে ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!