এমন দৃশ্য দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নুরপুর লামার বাড়ি গ্রামে।
এই গ্রামে একটি টুপি কারখানা গড়ে উঠেছে। এখানকার তৈরিকৃত টুপি নিজ জেলার পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়। সেই সঙ্গে রফতানি করা হচ্ছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, ইরাক, কাতার ও দুবাইয়ে। এই কারখানায় পুরুষদের পাশাপাশি এলাকার অনেক নারী কাজ করছেন।
.png)
একাধিক নারী জানান, কারখানায় পুরুষ শ্রমিকরা নকশা ছাড়া টুপি তৈরি করেন। ওই টুপিতে তারা পাথর বসানোর কাজ করেন। এই কাজে তাদের কোনো পুঁজি নেই। মালিক সব কিছু দিচ্ছেন। তারা শুধু চুক্তিতে কাজটা করছেন।
জানা যায়, আজ থেকে ১০ বছর আগে নুরপুর লামার বাড়িতে ভাড়ায় মো. শাহেদ আলী মুন্সি নামে এক উদ্যোক্তা বধূবরণ শাড়ি বিচিত্রা অ্যান্ড আলবাছির ক্যাফ প্রোডাক্ট নামে একটি কারখানা গড়ে তুলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের মো. আব্দুল বাছির মুন্সির ছেলে। এই কারখানাতে জালি টুপি, গোল টুপি, খানকা টুপি, লম্বা টুপি, বেতের টুপি, তুর্কি টুপি ও কিস্তিসহ নানা জাতের টুপি তৈরি করছেন। প্রত্যেকটি টুপিতে পাথর আর নকশায় আলাদা রয়েছে। অতি স্বল্প সময়ে ওই গ্রামটি টুপি তৈরির গ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করে।
কারখানার মালিক মো. শাহেদ আলী মুন্সি জানান, ছোট বেলা থেকেই তার একটা ইচ্ছা ছিল দেশের মাটিতে কোনো কিছু করার। পাশাপাশি সুই সুতায় কাজে কিছু একটা করার প্রতিনিয়ত তিনি স্বপ্ন দেখতেন। গ্রামের সমবয়সীরা নানা কর্মে চলে যাওয়ায় নিজে একটা কিছু করতে আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে টুপি ও শাড়িতে কাজ শিখতে তিনি ঢাকায় যান। সেখান থেকে এই কাজ শেখে তিনি বাড়িতে চলে আসেন। এর পর নিজে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে বাড়িতে প্রথমে টুপির কারখানা গড়ে তুলেন। শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ বাদে প্রথম বছর তিনি এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন। এভাবে শুরু হয় তার ব্যবসা। বর্তমানে তার কারখানাতে ৯ জন পুরুষ ও ২৫ জন নারী কাজ করছেন।
তিনি আরো জানান, কারখানায় পুরুষরা টুপি তৈরি করছেন আর নারীরা তাদের বাড়িতে বসে পাথর বসানোর কাজ করছেন। কাজ অনুযায়ী তাদের মজুরি দেওয়া হয়। একজন পুরুষ ১ ডজন টুপি তৈরিতে মজুরি পান ১০০ টাকা। আর নারীরা ১ ডজন টুপিতে পাথর বসালে দেওয়া হয় ২০ টাকা। তার এই টুপি দেশের মধ্যে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সেই সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে বিদেশের মাটিতেও।
তিনি জানান, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখানে এসে টুপি ক্রয় করে নিয়ে যায়। বাহিরের ব্যবসায়ীরা অর্ডার দিলে তাদের কাছে টুপি পাঠানো হয়। এই রমজানে টুপির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। শ্রমিকের অভাবে চাহিদানুযায়ী মালামাল দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
নারী শ্রমিক আরজু বেগম জানান, তার স্বামী কৃষি কাজ করেন। স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হওয়ায় তিনি টুপিতে পাথর সবানোর কাজ করছেন। প্রথমে কয়েক দিন এটি করতে কষ্ট হয়েছে। এখন আর কোনো অসুবিধা হয় না। এ কাজ করে তিনি প্রতি মাসে ৪-৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
কলেজশিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার জানান, তার পরিবারে অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। লেখাপড়ার খরচ চালাতে খুবই কষ্ট হয়। তাই বাড়িতে অবসর সময় টুপিতে পাথর বসানোর কাজ করেন। এ কাজ করে তিনি প্রতিমাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা আয় করছেন। নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে পাশাপাশি বাবা-মাকেও সাহায্য করছেন তিনি।
কারখানার শ্রমিক মো. জুয়েল নাঈমি জানান, এই কারখানায় তিনি গত ৭ বছর ধরে কাজ করছেন। এই কাজে মাসিক কোনো বেতন নেই। কাজ অনুযায়ী বেতন হয়। প্রতিটি কারিগরের একটা টার্গেট থাকে। ওই টার্গেট অনুযায়ী কাজ করেন। অনেক সময় ওই টার্গেট ছাড়িয়ে যায়।
উপজেলার দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান মো. জালাল উদ্দিন জানান, গ্রামের মধ্যে টুপি তৈরির কারখানা গড়ে তুলে এলাকার লোকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষদ্র উদ্যোক্তাদের সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।