বাংলাদেশে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি যক্ষ্মা রোগী রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। যদিও জেলায় বছরের ব্যবধানে কমেছে যক্ষ্মা আক্রান্তের সংখ্যা। ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলায় যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯৯১ জন। তাদের মধ্যে ৬৬৬ জন শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসায় সুস্থতার হার ৯৭ শতাংশ।
সূত্র জানায়, আক্রান্তদের মধ্যে ক্যাটাগরি-১ অনুযায়ী যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৯৩৩ জন ও পুনরায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৫৮ জন। শনাক্ত মোট যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে ফুসফুস আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৫৪৫ জন ও ফুসফুসবহির্ভূত রোগী পাঁচ হাজার ৪৪৬ জন। যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে ছয় হাজার ৩৯৬ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে।
.png)
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২১ সালে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয় ২০ হাজার ৮৫৭ জন। ২০২২ সালে চার হাজার ৮৬৬ জন কমে তা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৯৯১ জনে। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে যক্ষ্মা রোগী কমেছে ২৩ শতাংশ। এর আগে ২০২০ সালে ১৪ হাজার ১১৬ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, টিউবারকিউলোসিস (টিবি) বা যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসের ব্যাধি নয়। এটি বায়ুবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক ব্যাধি, যেটা মাইক্রোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে। সরকারের আন্তরিকতার কারণে দেশের হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যক্ষ্মা রোগীরা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যক্ষ্মা রোগের পর্যাপ্ত পরিমাণ চিকিৎসা সামগ্রীও রয়েছে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। পরিবারে যক্ষ্মা রোগী থাকলে শিশুসহ অন্য সবাইকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে যক্ষ্মা নির্মূল সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে ত্বক, অন্ত্র, লিভার, কিডনি ও হাড়সহ শরীরের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যক্ষ্মার সংক্রমণ হতে পারে। যক্ষ্মা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। ফুসফুসে যক্ষ্মার জীবাণু সংক্রমিত হলে টানা কয়েক সপ্তাহ কাশি ও কফের সাথে রক্ত যায়। আমাদের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে যক্ষ্মা হয় না।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি অংশ জন্মগতভাবে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু বহন করে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের এ রোগের ঝুঁকি বেশি। পরিবেশ দূষণ, দরিদ্রতা, মাদকের আসক্তি ও অপুষ্টি যক্ষ্মার হার বাড়ার অন্যতম কারণ। এ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে ভয় না করে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তাহলে নির্দিষ্ট সময়ে এ রোগ পুরোপুরি সেরে যাবে। এখন যক্ষ্মা হলে রক্ষা মেলে।
তিনি আরো বলেন, নিয়মিত, ক্রমাগত সঠিক মাত্রায় ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওষুধ সেবন করলে যক্ষ্মা ভালো হয়। কোভিডকালীন সময়ে যক্ষ্মা কার্যক্রম সাময়িক ব্যাহত হলেও ২০২২ সালে সে অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রেখে ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি বিশ্বের এমন ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীতে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে এটিকে ‘গ্লোবাল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দীর্ঘকাল ধরে অন্যতম প্রধান সংক্রামক রোগের স্থান দখল করে থাকা যক্ষ্মাতে প্রতিদিন বিশ্বে চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। আক্রান্ত হন ৩০ হাজার। বিশেষ করে দারিদ্র্য ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতেই এটির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে সময়ে এসেও যক্ষ্মা নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে মানুষের। এসব ধারণা দূর করে যক্ষ্মা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে নয়
অনেকের ধারণা- যক্ষ্মা শুধুমাত্র ফুসফুসেই দেখা দেয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বলছেন, যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুস ছাড়াও ত্বক, অন্ত্র, লিভার, কিডনি, হাড়সহ শরীরের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ হতে পারে। তবে ফুসফুসে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফুসফুসের বাইরে হওয়া যক্ষ্মাকে ‘এক্সট্রাপালমোনারি টিউবারকিউলোসিস’ বলে।
যক্ষ্মা জেনেটিক রোগ নয়
কারো কারো মতে- যক্ষ্মা একটি জেনেটিক রোগ। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভাষ্য, যক্ষ্মা কোনো জেনেটিক রোগ নয়। এটির বিস্তারের সঙ্গে জিনের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট এ রোগ যেকোনো মানুষের হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা।
ধূমপান না করলেও আছে যক্ষ্মার সম্ভাবনা
ধূমপান না করলে যক্ষ্মা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই- এমন ধারণা নিয়ে বসবাস করেন অনেকেই। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ধূমপানই যক্ষ্মার একমাত্র কারণ নয়। অন্যান্য রোগ, যেমন- এইচআইভি, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। এছাড়া ধূমপান শুধুমাত্র ফুসফুস নয়, মস্তিষ্ক, হাড়, মেরুদণ্ড ও চোখকেও প্রভাবিত করে।
যক্ষ্মার সংক্রমণ বোঝায় উপায়
চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরের কোনো অংশ যক্ষ্মার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে সেই অংশটি ফুলে উঠবে। যেমন- গলার গ্লান্ড আক্রান্ত হলে গলা ফুলে যাবে, মেরুদণ্ডে আক্রান্ত হলে পুরো মেরুদণ্ড ফুলে উঠবে। তবে ফোলা অংশটি খুব শক্ত বা তরল জাতীয় হবে না। সেমি সলিড হবে। ফোলার আকার বেশি হলে ব্যথাও হতে পারে।
লিভারে যক্ষ্মা হলে পেটে পানি চলে আসে, ফলে পেট অস্বাভাবিক ফুলে যায়। মস্তিষ্কে সংক্রমিত হলে সেখানেও পানির মাত্রা বেড়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক যে ইডিমা বা পানির মধ্যে থাকে, সেটার পরিমাণ বেড়ে যায়।
এছাড়া চামড়া বা অন্য কোনো অংশে হলেও সেটি ফুলে উঠবে। এর বাইরে ক্ষুধামন্দা, হঠাৎ শরীরের ওজন কমে যাওয়া, জ্বর জ্বর অনুভব হওয়া, অনেক ঘাম হওয়া ইত্যাদি যক্ষ্মার প্রাথমিক লক্ষণ।
চিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয়
যক্ষ্মা রোগের কোনো চিকিৎসা নেই- এখনো এমন ধারণা মনে পোষণ করেন অনেকেই। তবে ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। যক্ষ্মার লক্ষণ কিংবা উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিলেই যক্ষ্মা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যক্ষ্মা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হওয়ায় এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ খেতে হয়। যেটা ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বিসিজি টিকা
টিকাটির পুরো নাম ‘ব্যাকিলাস ক্যালমেট-গেরিন’। এ টিকা প্রধানত যক্ষ্মার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব কমাতে শিশুদের জন্মের পর এটির একটি ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে এইচআইভি কিংবা এইডস আক্রান্তদের শিশুদের জন্য এ টিকা প্রযোজ্য নয়।
১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কোচ যক্ষ্মার জীবাণু আবিষ্কার করেন। এর ফলে উন্মোচিত হয় যক্ষ্মার রোগনির্ণয় ও নিরাময়ের পথ। বিশ্বে মৃত্যুজনিত ১০টি রোগের মধ্যে যক্ষ্মা একটি। তাই যক্ষ্মার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।