ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

নেত্রকোনায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যু

রিফাত আহমেদ রাসেল, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ১৯:৫৫, ৩০ আগস্ট ২০২১
নেত্রকোনায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যু
আত্মহত্যা: প্রতীকী ছবি

নেত্রকোনায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। নানা বয়সের নারী পুরুষ ফাঁস দিয়ে, বিষপানে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। জেলায় গত ৬ মাসে (জানুয়ারী-জুন) ৯৪ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তার মধ্যে নারীর সংখ্যার তুলনায় দ্বিগুণ পুরুষ। তবে কি কারণে এমন ঘটনা ঘটছে, এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পুলিশ প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ।

গত মঙ্গলবার সকালে দুর্গাপুর উপজেলায় ঘরের আড়ায় এক বালু শ্রমিক আইনাল গলায় গামছা লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। সোমবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে নেত্রকোনা শহরের কুড়পাড় ভুইয়া বাড়ি নিবাসী তোফায়েল নামের দত্ত স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়োয়া এক শিক্ষার্থী গামছা দিয়ে নিজ ঘরের আড়ায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

অন্যদিকে জেলার পুর্বধলা উপজেলার আবুল হাসেম খান নামে এক বৃদ্ধ ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ওই বৃদ্ধ উপজেলার বিশকাকুনী ইউনিয়নের ধোবারুহী গ্রামে নিজ বাড়িতে ঘরের আড়ার সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কিশোর তোফায়েল মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যদিকে পুর্বধরার বৃদ্ধ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। শুক্রবার (২০ আগস্ট) মোহনগঞ্জ উপজেলার পাবই গ্রামে বাড়ির কাছে আম গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় আলতু সিদ্দিক (৭৬) নামে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এর আগে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ‘খ’ শাখার এক রোল নম্বরধারী মেহেনাজ তাবাসসুম উষা নামে এক শিক্ষার্থী গলায় ওড়না পেচিয়ে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে স্কুলশিক্ষক বাবা মা দেখে নামিয়ে ফেললেও আটদিন হাসপাতালে চিকিৎসায় থেকে অবশেষে মারা যায়।

নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ বছরের জানুয়ারি জুন পর্যন্ত ৯৪ জনের মধ্যে ৬১ জন পুরুষ ও ৩৩ জন নারী রয়েছে।

তাদের মধ্যে ফাঁসিতে ঝুলে ৭৩ জন এবং বিষপানে ২০ জন ও গায়ে আগুন ধরিয়ে ১ জন মারা যায়। বয়স অনুসারে ১৮ বছরের নিচেই রয়েছে ৩৩ জনের মধ্যে ২১ জন পুরুষ ও ১২ জন নারী। ১৯ থেকে ৩০ বছরের বয়সী ৩৭ জনের মধ্যে ২৪ জন পুরুষ ও ১৩ জন নারী। ৩১ থেকে ৪৫ বছরের বয়সী ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৫ জন নারী। ৪৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৭ জনের মধ্যে ৪ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। ৬০ বছরের উপরে দুজনই পুরুষ।

জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং তারুণ্য সংগঠক হিমু পাঠক আড্ডার প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক আলপনা বেগম বলেন, ৯৪ জনের মধ্যে ৩৩ জনই ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ শিশু এবং কিশোর। এই বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় শিশু কিশোরদের জন্য। একে তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ তার মধ্যে সুস্থ কোনো বিনোদন নেই। হয় শিশুরা মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে। নয়তো মাদকে। বয়ঃস্বন্ধিকালীন সময়ে এমনিতেই শিশুদের শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তন ঘটে। তখন নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার আছে শিশুদের কথা শুনতে চায় না। তারমধ্যে গ্রামেই এ সমস্যা বেশি। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করে না বেশির ভাগ বাবা মা ই। তখন তারা মনের কথা বলতে বন্ধু বান্ধব খুঁজে। অথবা মোবাইলের দিকে আসক্ত হয়। এছাড়া মাদকের নেশায় চলে যায় অনেক শিশু। সেজন্য বাবা মা বা পরিবারের সবার প্রয়োজন শিশুদেরকে সময় দেওয়া। পাশাপশি তাদের সমস্যাগুলো শুনে সে অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া। আমাদের রক্ষণশীল সমাজে এখনো এ বিষয়টিকে এতটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। আবার কিছু কিছু পরিবার অতি আধুনিক হওয়াতেই কিছু বিপত্তি ঘটছে।

সার্বিকভাবে বলা যায় বই থেকে দূরের শিশুরাই বেশিরভাগ এ পথ বেছে নিচ্ছে। পরে বাবা মা দের মধ্যে অনেকেই একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগল প্রায় হচ্ছেন। এ জন্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প উপন্যাস পড়ায় যেমন শিশুদের আগ্রহী করে তুলতে হবে, তেমনি সুস্থ বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক চর্চা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মূলকথা সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের মনোজগতে সুস্থ ধারার বিনোদন অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর আরেকটি উপাদান খেলাধুলা। শিশুরা আজকাল খেলাধুলা করতেই সুযোগ পায় না। সেটির ব্যবস্থাও করে দিতে হবে।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুনসী বলেন, সংখ্যাগুলো খবুই উদ্বেগের। আমরা প্রতিটি মৃত্যুর তদন্তে দেখলাম যে বৃদ্ধের সংখ্যাও কম নয়। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একা থাকেন। এছাড়াও শিশু কিশোরদের বিষয়গুলো অভিভাবকরা পরিষ্কার করেন না। যে কারণে সঠিক কারণ বের করা যাচ্ছে না। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রেম সংক্রান্ত, আবার মাদক সংক্রান্তও থাকে। কখনো কখনো পরিবারের সঙ্গে রাগ করে এ পথ বেছে নেয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!