ঢাকা,  সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সংযোগ ]

শিশুর শৈশব যেন স্ক্রিনে হারিয়ে না যায়

ডেইলি বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:৩৪, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশুর শৈশব যেন স্ক্রিনে হারিয়ে না যায়
শুধু শিক্ষক বলবেন আর শিক্ষার্থীরা শুনবে তা নয়; আলোচনা, জোড়ায় কাজ ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগই গড়ে তোলে একটি আদর্শ ও কার্যকর শ্রেণীকক্ষ

-তাহমিনা রহমান

সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল, খাওয়ার সময় ভিডিও, বিকেলে ইউটিউব, রাতে ঘুমানোর আগে আবার কার্টুনঅনেক পরিবারের শিশুর দিনের রুটিনে  স্ক্রিন এখন এমনভাবেই ঢুকে গেছে। ব্যস্ত বাবা-মায়ের জন্য মোবাইল অনেক সময় সহজ সমাধান। শিশু চুপ থাকে, খাওয়া শেষ হয়, বড়রাও নিজেদের কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে একটি প্রশ্ন থেকে যায়শিশুর কাছ থেকে আমরা কী সরিয়ে দিচ্ছি?

Advertisement

স্ক্রিন ব্যবহারের সমস্যা শুধু মোবাইল দেখার সময়টুকু নয়। একটি শিশু যখন দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে বসে থাকে, তখন সেই সময়টা আর খেলাধুলা, ঘুম, বই পড়া, গল্প করা কিংবা অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশায় যাচ্ছে না। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু কত ঘণ্টা মোবাইল দেখছে’—এমন নয়; বরং মোবাইলের কারণে আর কী কী হচ্ছে না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে স্ক্রিন দেখার পরিবর্তে সক্রিয় খেলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বড়দের সঙ্গে বই পড়া, গল্প বলা বা অন্য কাজে অংশ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির নির্দেশনায় এক বছর বয়সী শিশুদের জন্য বসে স্ক্রিন দেখার সময় সুপারিশ করা হয়নি। দুই বছর বয়সী এবং তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন সময় দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছেকম হলে আরও ভালো।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা মানসম্মত পর্দাভিত্তিক কনটেন্ট দেখার পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে খাওয়ার সময় এবং ঘুমের আগের এক ঘণ্টা স্ক্রিনমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সব সময় এতটা নিয়ন্ত্রিত নয়। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের ২০২৪ সালের একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু সুপারিশ করা সীমার মধ্যে স্ক্রিন ব্যবহার করে। একই পর্যালোচনায় মহামারির শুরুর দিকে শিশু-কিশোরদের গড় মোট স্ক্রিন ব্যবহারের সময় প্রায় ৭.৭ ঘণ্টা প্রতিদিন পাওয়া গিয়েছিল, যা মহামারির আগে ছিল ৩.৮ ঘণ্টা।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার স্ক্রিন নিজেই শত্রু নয়। অনলাইন বই, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভিডিও কল কিংবা সৃজনশীল নানা কাজেও প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন স্ক্রিন অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের জায়গা দখল করে নেয়।

ধরা যাক, একটি শিশু প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা মোবাইল দেখছে। এই দুই ঘণ্টা শুধু দুই ঘণ্টা স্ক্রিন নয়। ওই সময়টুকুতে সে হয়তো মাঠে খেলতে পারত, সাইকেল চালাতে পারত, মায়ের সঙ্গে গল্প করতে পারত, বাবার সঙ্গে ছবি আঁকতে পারত, বই দেখতে পারত কিংবা অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে পারত। শিশুর বিকাশের জন্য এসব অভিজ্ঞতার প্রত্যেকটির আলাদা মূল্য আছে।

ঘুমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে ২৫টি গবেষণায় ৪,৫৬২ জন শিশু, কিশোর ও তরুণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। সেখানে দৈনিক বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমাতে যাওয়ার সময় কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা অবশ্য মোট ঘুমের সময় বা ঘুমের মানের সব সূচকের সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক পাননি। অর্থাৎ স্ক্রিন ঘুমের সম্পর্ক সরল নয়, তবে বিশেষ করে ঘুমের সময়ের কাছাকাছি স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

আরেকটি গবেষণা-পর্যালোচনায় শোবার ঘরে মোবাইল বা অন্য পর্দার উপস্থিতি এবং রাতে সেগুলোর ব্যবহার শিশুদের কম ঘুম, খারাপ ঘুমের মান ও দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে।

তবে এসব তথ্যের অর্থ এই নয় যে শিশুর হাতে থাকা প্রতিটি মোবাইলই ক্ষতিকর। বরং বয়স, সময়, কনটেন্ট এবং ব্যবহারের ধরন সবগুলো বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে। দুই ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে বসে কোনো শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখা আর দুই ঘণ্টা একা একা দ্রুতগতির ভিডিও দেখা এক বিষয় নয়।

তাই মোবাইল একেবারেই দেওয়া যাবে নাএমন কঠিন নিয়মের চেয়ে ঘরের কিছু নিয়ম বেশি কাজে লাগতে পারে। যেমন, খাবার টেবিলে ফোন থাকবে না। ঘুমানোর আগে ফোন বন্ধ থাকবে। শোবার ঘরে মোবাইল রাখা হবে না। শিশুকে ফোন দেওয়ার আগে ঠিক করা থাকবে কতক্ষণ ব্যবহার করবে। সময় শেষ হলে প্রতিদিন একই নিয়মে সেটি সরিয়ে নেওয়া হবে।

সবচেয়ে জরুরি হলো বিকল্প তৈরি করা। মোবাইল বন্ধ করে শিশুকে যদি বলা হয়, এখন কী করবে করো, তাহলে সে আবার ফোন চাইবে। কিন্তু পাশে বসে গল্প বলা, ছবি আঁকা, পাজল দেওয়া, বল নিয়ে খেলতে যাওয়া, বই পড়া বা বাইরে হাঁটতে বের হওয়ার অভ্যাস তৈরি করা গেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

এখানে বাবা-মায়ের নিজেদের অভ্যাসও বড় বিষয়। শিশুকে ফোন থেকে দূরে থাকতে বলে বড়রা যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেই নিয়ম খুব একটা কার্যকর হবে না। শিশুর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ অনেক সময় কোনো বক্তৃতা নয়, পরিবারের বড়দের আচরণ।

শিশুকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু খেলাধুলা, ঘুম, বই, পরিবার, বন্ধু এবং বাস্তব পৃথিবীর অভিজ্ঞতাগুলোকে সরিয়ে দিয়ে নয়।

কারণ শিশুর শৈশব একবারই আসে। মোবাইলের পর্দায় হাজারো ভিডিও পরে দেখা যাবে; কিন্তু যে বিকেলটি খেলাধুলা না করে কেটে গেল, যে গল্পটি শোনা হলো না, যে মাঠে যাওয়া হলো না সেই সময়টা আর ফিরে আসবে না।

লেখক পরিচিতি:  লেখক, প্যারেন্টিং এক্সপার্ট এবং কিডস টাইমের প্রতিষ্ঠাতা

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!