সোমবার রাতে রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে রাবেয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী স্বামী হাবুল বেপারীকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানায়, ক্ষোভ ও পরকীয়ার সন্দেহে রাবেয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেন স্বামী হাবুল। হাবুল তার দুলাভাই সূর্য্য মোল্লাকে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনার করেন। সূর্য্য মোল্লার ভিকটিম রাবেয়ার প্রতি আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল। পাশাপাশি রাবেয়ার কাছ থেকে নেয়া টাকা ফেরত না দেওয়ার কৌশল হিসেবে হত্যায় সহযোগিতা করেন সূর্য্য।
.png)
মঙ্গলবার দুপুরে কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, গত ১৩ আগস্ট আনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটে ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী এলাকায় ঘরের পেছনে সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে রাবেয়া বেগম নামে এক গৃহবধূর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় ভিকটিমের ভাই বাদী হয়ে ফরিদপুর জেলার সদরপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। সেই সূত্র ধরে র্যাব এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গোয়েন্দা নজদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
খন্দকার আল মঈন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হাবুল হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন। তিনি র্যাবকে জানিয়েছেন, ৭ বছর আগে রাবেয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই রাবেয়ার বাবার বাড়িতে থাকতেন। গত কয়েক মাস ধরেই তার স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ ছিল। স্ত্রী রাবেয়ার পরকীয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করতেন তিনি। এছাড়া হাবুলের স্থায়ী কোনো কাজ ছিল না। তিনি মাঝে মাঝে ফার্নিচার দোকানে রং মিস্ত্রির কাজ করতেন। ফলে স্ত্রীর তুলনায় আয় কম ছিল। রাবেয়া একটি এনজিওতে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
র্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, হাবুলের উপার্জন কম থাকায় প্রায়ই সে স্ত্রীর কাছে বিভিন্ন খরচের জন্য টাকা চাইত। যেহেতু রাবেয়ার আয়ের টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয় চালাত, এ জন্য হাবুলকে টাকা দিত না। যার ফলে রাবেয়ার প্রতি হাবুলের পরকীয়ার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। হাবুলের দুলাভাই সূর্য্য মোল্লা বিভিন্ন সময়ে রাবেয়ার কাছ থেকে বেশকিছু টাকা ধার নিয়েছে এবং ধারকৃত টাকা পরিশোধের জন্য রাবেয়া চাপ প্রয়োগ করলে সূর্য্য মোল্লার সঙ্গে কথা কাটাকাটি এবং ঝগড়া হতো।
তিনি আরো জানান, এক পর্যায়ে হাবুল স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ ও পরকীয়ার সন্দেহে রাবেয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করে। হাবুল তার দুলাভাই সূর্য্য মোল্লাকে পরিকল্পনার বিষয়টি জানায়। সূর্য্য মোল্লার রাবেয়ার প্রতি পূর্বের ক্ষোভ থাকায় শ্যালক হাবুলের হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি হন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১১ আগস্ট রাতে হাবুল ও তার দুলাভাই রাবেয়ার বাড়িতে আসেন এবং বাসার সবাই একত্রে রাতের খাবার খান। রাত ১০টা ৩০ মিনিট সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় হাবুল, সূর্য্য মোল্লা ও রাবেয়া চেয়ারে বসে আলাপচারিতা করছিলেন। এক পর্যায়ে হাবুল সুযোগ বুঝে অতর্কিতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন ও হাবুলের দুলাভাই রাবেয়ার হাত পিছন থেকে চেপে ধরে নির্মমভাবে হত্যা করেন।
হত্যাকান্ডের বিষয়টি কেউ যেন জানতে না পারে এ জন্য রাবেয়ার মরদেহ গুম করতে ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে বের করে টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকের মধ্যে ফেলে দেন। হাবুলের দুলাভাই রাতেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান। পরদিন সকালে নিহতের মা হাবুলের কাছে রাবেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে এনজিওর কাজে অফিসে গিয়েছেন বলে জানান এবং তার শাশুড়িকে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন।
এক পর্যায়ে হাবুল তার শাশুড়িকে জানান, জরুরি কাজে তাকে ঢাকা যেতে হবে। এই কৌশলে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আসার পরিকল্পনা করেন। হাবুল বেশকিছু অলংকার এবং টাকা নিয়ে রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়া এলাকায় আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘদিন এ এলাকায় কাজ করার সুবাদে তার অনেক পরিচিতি এবং বন্ধু-বান্ধব ছিল। তিনি বন্ধুদের কাছে আত্মগোপনে থাকার পরিকল্পনা করছিলেন।
এদিকে হাবুল বাড়ি থেকে চলে যাওয়ায় তার শাশুড়ির সন্দেহের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে এনজিও অফিসে ফোন করে জানতে পারেন অফিস বন্ধ এবং ভিকটিম অফিসে যাননি। পরবর্তীতে ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুজি শুরু করেন। গত ১৩ আগস্ট বসতঘরের পেছনে টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা এলোমেলো দেখতে পেয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হলে ঢাকনাটি সরিয়ে ভিকটিমের অর্ধগলিত মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়।