বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ
- ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
- গত দুই দশকে বাংলাদেশে ১৮৫টিরও বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।
- ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ১৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, অনুমিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। (আইএমএফ, ২০২৫)
দুর্যোগ মানুষের জীবন, জীবিকা, সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস ও অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতা, যথাযথ প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
টানা বৃষ্টি, পাহাড় ধস আর উজানের ঢলে গত জুলাইয়ে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয় দেশে। মাস তিনেক আগের ওই দুর্যোগে ১০ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক লাখ মানুষ; চার দশেকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি ঝরে চট্টগ্রাম; তলিয়ে যায় নগরের বহু এলাকা। অতি ভারি বর্ষণে তীব্র জলাবদ্ধতার মুখে পড়ে রাজধানী ঢাকাও। এর আগে এপ্রিল-মে মাসে ছিল বজ্রপাতের দাপট। ২৬ এপ্রিলে শুধু এক দিনে সাত জেলায় ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর ৪ জুন তাপপ্রবাহের বিস্তার ছড়িয়ে পড়ে অন্তত ৪৮ জেলায়। ভূমিকম্প, স্বল্পমেয়াদী বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগও ছিল।
আজ আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। United Nations Office for Disaster Risk Reduction (UNDRR) কর্তৃক নির্ধারিত দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Resilience Starts at home’ বাংলা ভাবানুবাদ ‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ দেশে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ দেখা দেয়। এ ছাড়া, রয়েছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ভবন নির্মাণবিধি না মানা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
৩০ বছরের কালবৈশাখীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘অ্যান ওভারভিও অব থান্ডারস্টর্মস ওভার বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের সর্বোচ্চ ৬৬ দিন বজ্রপাতের ঘটনাও দেশে আছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে মে মাসে; ডিসেম্বরে সবচেয়ে কম।
গবেষণা প্রতিবেদনটি ২০২২ জুনে বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
১৯৮১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যকার তথ্য-উপাত্ত বলছে, দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলই সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ। এরপরই উত্তরাঞ্চল, মধ্য পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল রয়েছে।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে। তবে নতুন নতুন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। বিশেষ করে ভূমিধস, বজ্রপাত, আকস্মিক বন্যা, অতি বৃষ্টি, তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ বেড়েছে।
- দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে মৃত্যু হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের। বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে দুর্যোগও ঘোষণা করা হয়। বজ্রপাত থেকে রক্ষায় এক সময় তালগাছ লাগানোর পদক্ষেপ নিলেও তা থেকে সরে আসে তৎকালীন সরকার। এরপর বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্পও নেওয়া হয়; এতেও তেমন সুফল মিলছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব
* ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্যোগে ৪৩,৮২৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ জন।
* বন্যায় ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা, ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি টাকা, বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকা ও ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।
* ৫ বছরে আড়াই হাজার মৃত্যুর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশই বজ্রপাতে।
* বিভিন্ন দুর্যোগে বার্ষিক প্রাণহানির প্রবণতা কমেছে। ২০২১ সালে ৬০৩ জন, ২০২২ সালে ৫৯১ জন, ২০২৩ সালে ৫০৯ জন, ২০২৪ সালে ৫৩৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৯৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
* বন্যায় ১৯৭ জন, ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন, অগ্নিকাণ্ডে ৬৫৪ জন, বজ্রপাতে ১৫৩০ জন, ভূমিকম্পে ১০ জন ও পাহাড় ধসে ৯০ জনের মৃত্যু হয়।
সচেতনতা বাড়ানো এবং জোড়ালো প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৮৯ সালে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। এরপর ২০০৯ সালে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতি বছরের ১৩ অক্টোবর এ দিবসটি পালন করা হবে।
দুর্যোগ প্রশমনে ১০টি লোকজ জ্ঞান
সাধন সরকার
ভিটেমাটি উঁচু করা: বন্যাপ্রবণ এলাকায় মানুষ ঘরের ভিটে উঁচু করেন। তারা আগের বন্যার পানির উচ্চতা দেখে ভিটে তৈরি করেন। ফলে সাধারণ বন্যায় ঘরে পানি ঢোকে না। এতে ঘরবাড়ি, গোলাঘর ও গৃহপালিত পশু নিরাপদ থাকে।
ঘরের ভেতর মাচা তৈরি করা: হাওর ও নিন্মাঞ্চলে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে মাচা বানানো হয়। পানি ঘরে ঢুকলেও চাল, বীজ, শুকনো খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র ওপরে রাখা হয়। এটি দুর্যোগের সময় পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
চারচালা বা ঢালু ছাদ: উপকূলীয় ঘরে চারদিকে ঢালু ছাদ দেওয়া হয়। এতে ঝড়ের বাতাস সরাসরি ঘরে আঘাত করতে পারে না। বাতাসের চাপ ছড়িয়ে যায়। ফলে ঘর ভাঙার ঝুঁকি কমে।
ভাসমান কৃষি বা ধাপ চাষ: কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভাসমান ক্ষেত তৈরি করা হয়। পানি বাড়লে ক্ষেতও ভেসে ওঠে। এতে বন্যার সময়ও সবজি ও খাবার পাওয়া যায়। এটি খরচ কম এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি।
নদীর পাড়ে গাছ লাগানো: নদীর পাড়ে বাঁশঝাড়, ঢোলকলমি ও ছন লাগানো হয়। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। ফলে স্রোতের আঘাতে মাটি সহজে ধসে পড়ে না। এতে নদীভাঙন কমে।
উপকূলে সবুজ বেষ্টনী: উপকূলে কেওড়া, গোলপাতা ও হেঁতাল গাছ লাগানো হয়। এই গাছগুলো ঝড়ের বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের গতি কমায়। ফলে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি কমে। এটি প্রাকৃতিক একটি সুরক্ষা দেয়াল।
বাড়ির পাশে লম্বা গাছ লাগানো: সুপারি, নারকেল বা তাল গাছ লাগানোর রেওয়াজ আছে। এসব গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমায়। ঝড়ের সময় ঘরকে কিছুটা আড়াল করে রাখে। এছাড়া এগুলো থেকে ফল, ছায়া ও কাঠও পাওয়া যায়।
জোয়ার-ভাটা ও তিথি দেখে সাগরে যাওয়া: জেলেরা চাঁদের তিথি, মরা কোটাল ও ভরা কোটাল দেখে সাগরে যান। তারা উজান-ভাটির টানও হিসাব করেন। এতে ঝড়ো সময়ে নৌকা নিয়ে সাগরে যাওয়া এড়ানো যায়। এতে নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।
নদীর মোহনায় বাঘার বা জাঁক তৈরি: বাঁশ ও ডালপালা দিয়ে কৃত্রিম ঝোপ তৈরি করা হয়। এটি মাছের প্রজননে সাহায্য করে। পাশাপাশি স্রোতের আঘাত কমিয়ে নদীভাঙন রোধ করে। এটি জীবিকা ও পরিবেশ-দুটোই রক্ষা করে।
হালকা ও দ্রুত পুনর্নির্মাণযোগ্য ঘর: কাদা, তুষ, বাঁশ ও গোলপাতা দিয়ে ঘর বানানো হয়। এই ঘরগুলো হালকা হওয়ায় ঝড়ে প্রাণহানির ঝুঁকি কম। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কম খরচে দ্রুত আবার তৈরি করা যায়। এটি দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান।
সমাধান ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন:
পরিকল্পিত বসতি ও আইন মানা: ভবন নির্মাণবিধি (বিল্ডিং কোড) কড়াকড়ি করা এবং বাঁধ ও নদী ব্যবস্থাপনা উন্নত করা।
পরিবারপর্যায়ে প্রস্তুতি: ঘরবাড়িতে জরুরি যোগাযোগের নম্বর, ফার্স্ট এইড কিট, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র এক জায়গায় নিরাপদে গুছিয়ে রাখা।
স্থানীয় মহড়া ও বিনিয়োগ: আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সাথে সাথে নির্দেশিকা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পারিবারিক অভ্যাস ও সচেতনতা গড়ে তোলা।
দুর্যোগ সম্পূর্ণ রোধ করা না গেলেও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর পূর্বাভাস ও পারিবারিক সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।