প্রাণীরা হারিয়ে গেলে মানুষ কি নিরাপদ থাকবে
৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস। পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্ব, সহমর্মিতা এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন এটি। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিনটি শুধু ভালোবাসার কথা বলার দিন নয়; বরং আমাদের চারপাশ থেকে নীরবে হারিয়ে যেতে থাকা প্রাণীদের কথা নতুন করে ভাবার দিন।
একসময় বাংলাদেশের বন, নদী, হাওর-বাঁওড়, জলাভূমি ও গ্রামবাংলা ছিল অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। বাঘ, হাতি, হরিণ, বনমহিষ, গণ্ডার, ময়ূর, কুমিরসহ নানা প্রজাতির প্রাণী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচরণ করত। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। মানুষের জনসংখ্যা বেড়েছে, কৃষিজমি ও বসতি বেড়েছে, শহর সম্প্রসারিত হয়েছে, বন কাটা হয়েছে, জলাভূমি ভরাট হয়েছে। একই সঙ্গে শিকার, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপও বেড়েছে। এক কথায় প্রকৃতির ভারসাম্য নিয়ে চিন্তিত
.png)
- ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে এদিনকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সারাবিশ্বে দিবসটি পালন করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক নেচার ওয়াচ ফাউন্ডেশন। এছাড়া প্রাণী কল্যাণমূলক বিভিন্ন সংস্থাও দিবসটি পালন করে থাকে।
- হেনরিক জিম্মারমেন নামের একজন জার্মান লেখক ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিন স্পোর্টস প্যালেসে সর্বপ্রথম বিশ্ব প্রাণী দিবস উদযাপন করেন। পরে ১৯২৯ সালে দিবসটি ৪ অক্টোবর পালন করা হয়।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীর ভূমিকা:
প্রকৃতি ও ভারসাম্য—এ দুটির সঙ্গে আমরা খুব পরিচিত। প্রকৃতিরও বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের সহযোগিতা দরকার হয়। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। প্রাণীরা খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজালের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে।
অনেক প্রাণী গাছের পাতা, ফল ও বীজ খেয়ে জীবন ধারণ করে এবং বিভিন্ন প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। আবার পাখি ও অন্যান্য প্রাণী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো পতঙ্গ ফুলের পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া কিছু প্রাণী মৃত জীব ও জৈব পদার্থ পচন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, ফলে মাটিতে পুষ্টি ফিরে আসে। প্রকৃতির কোনো একটি প্রাণীর সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বা কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলে খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন ঘটে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
তাই প্রাণীদের রক্ষা করা এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রাণী ও উদ্ভিদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমেই প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে। এ জন্য প্রাণী প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ অসহায়।
বাংলাদেশে কত প্রাণী হারিয়ে গেছে?
বাংলাদেশে কতো সংখ্যক প্রাণী আছে এমন সঠিক তথ্য পাওয়া দুস্কর। তবে বাংলাদেশের প্রাণীবৈচিত্র্যের সংকট বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-সমর্থিত বৈজ্ঞানিক দলিল হলো IUCN Red List of Bangladesh 2015। ওই মূল্যায়নে সাতটি প্রাণী গোষ্ঠীর মোট ১,৬১৯টি প্রজাতি পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৯০টি প্রজাতিকে বিপন্ন বা Threatened হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—৫৬টি অতিবিপন্ন (Critically Endangered), ১৮১টি বিপন্ন (Endangered) এবং ১৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ (Vulnerable)।
- একই মূল্যায়নে ৩১টি প্রজাতিকে বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত (Regionally Extinct) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ৩১টির মধ্যে ছিল ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি এবং একটি সরীসৃপ। বন অধিদপ্তরের তথ্যেও ২০১৫ সালের রেড লিস্টের ভিত্তিতে একই সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। ‘বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত’ মানে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত নয়। কোনো প্রাণী হয়তো বাংলাদেশে আর নেই, কিন্তু পৃথিবীর অন্য দেশে এখনো তার অস্তিত্ব রয়েছে। আবার কোনো প্রজাতিকে বিপন্ন বলা মানে সেটি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে—এমনটিও নয়। বরং তার টিকে থাকার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা জরুরি—২০১৫ সালের পর প্রাণী প্রজাতির জাতীয় পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ নতুন রেড লিস্ট প্রকাশিত হয়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর ও IUCN Bangladesh নতুন করে জাতীয় Faunal Red List হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কত প্রজাতি এখন বিলুপ্ত, কতটি সংকটাপন্ন এবং কতটির অবস্থার উন্নতি বা অবনতি হয়েছে—তার আরও হালনাগাদ চিত্র পাওয়া যাবে।
শুধু প্রাণী নয়, হারাচ্ছে তাদের ঘর:
একটি প্রাণীকে রক্ষা করতে হলে শুধু প্রাণীটিকে রক্ষা করলেই হয় না; রক্ষা করতে হয় তার আবাসস্থল। বন উজাড় হলে শুধু গাছ কমে না—কমে যায় খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও প্রজননের জায়গা। বন ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হলে প্রাণীদের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একদিকে তাদের সংখ্যা কমে, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ে।
টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অভয়ারণ্যের ভেতরে বন উজাড়ের হার ছিল প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং ১৯৮৯ সালের তুলনায় প্রাথমিক বনের প্রায় ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গিয়েছিল। গবেষণাটি দেখিয়েছে, বনভূমির পরিবর্তনের সঙ্গে বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘাতের ঝুঁকিও বেড়েছে।
অর্থাৎ, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেই এলাকার বন, জলাশয়, খাদ্যশৃঙ্খল এবং প্রাণীর চলাচলের পথ বাস্তবে সুরক্ষিত রাখতে হয়।
নগরায়ণও কি প্রাণী বিলুপ্তির কারণ?:
আমরা মনে করি উন্নয়নের একটি অংশ হচ্ছে নগরায়ন। অবশ্যই। তবে নগরায়ণ নিজে অপরাধ নয়; অপরিকল্পিত নগরায়ণ বড় সমস্যা। একটি শহর যখন জলাভূমি ভরাট করে, খাল বন্ধ করে, গাছ কেটে, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে কংক্রিটে ঢেকে ফেলে, তখন সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের জায়গা সংকুচিত হয়।
- ঢাকার উদাহরণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহত্তর ঢাকার স্থায়ী জলাভূমির পরিমাণ ১৯৬৭ সালের প্রায় ২০৭ বর্গকিলোমিটার থেকে ২০১০-এর দশকে আনুমানিক ৫৫–৮৩ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছিল।
জলাভূমি শুধু পানি ধারণ করে না; এগুলো মাছ, পাখি, উভচর, সরীসৃপসহ বহু প্রাণীর আবাসস্থল। তাই একটি জলাভূমি ভরাটের অর্থ শুধু একটি খালি জায়গায় ভবন নির্মাণ নয়—একটি সম্পূর্ণ ক্ষুদ্র প্রতিবেশব্যবস্থা ধ্বংস করা।
বন উজাড়, শিকার ও দূষণ—সমস্যা বহুমুখী
- বাংলাদেশের প্রাণীদের সংকটের পেছনে একটি কারণ নয়, অনেকগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
প্রথমত, আবাসস্থল ধ্বংস। বন কাটা, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা এবং কৃষি বা অবকাঠামোর জন্য প্রাকৃতিক এলাকা পরিবর্তন প্রাণীদের আবাস সংকুচিত করছে।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী বাণিজ্য। প্রাণীকে খাদ্য, চামড়া, মাংস, শখ বা অবৈধ বাণিজ্যের জন্য হত্যা করা হলে ছোট জনসংখ্যার প্রজাতি দ্রুত বিপদের দিকে যায়।
তৃতীয়ত, দূষণ। নদী ও জলাশয়ের পানি দূষিত হলে মাছ ও জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো পরিবর্তন অনেক প্রাণীর আবাস ও খাদ্যপ্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করছে।
পঞ্চমত, মানুষের সঙ্গে সংঘাত। বন সংকুচিত হলে হাতি, বানর, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী খাদ্যের সন্ধানে মানুষের বসতিতে চলে আসতে পারে। তখন প্রাণীকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটির মূল কারণ হলো প্রাণীর পুরোনো আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়া।
৩১টি বিলুপ্তির সংখ্যা আমাদের কী বলে?
৩১টি সংখ্যা শুনে হয়তো মনে হতে পারে—সংখ্যাটি খুব বড় নয়। কিন্তু প্রকৃত বিপদ আরও গভীরে।
- ২০১৫ সালের মূল্যায়নে ১,৬১৯টি প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি Threatened হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। অর্থাৎ মূল্যায়ন করা প্রজাতিগুলোর প্রায় ২৪ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ২৭৮টি প্রজাতির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তাদের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায়নি। অর্থাৎ আমরা যেসব প্রাণীর অবস্থা জানি না, তাদের অনেককেই নিরাপদ ধরে নেওয়া যাবে না। প্রকৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেতগুলোর একটি হলো—কোনো প্রাণীকে যখন শেষবার দেখা যায়, তখন অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না যে সেটিই ছিল শেষ দেখা।
বাংলাদেশের সবুজ ময়ূরের কথাই ধরা যাক। IUCN Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই পাখিটির শেষ নথিভুক্ত দেখা পাওয়া যায় ১৯৩০ সালে। আবাসস্থল পরিবর্তন ও শিকার তার বিলুপ্তির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল।
তাহলে করণীয় কী?
প্রাণী রক্ষায় শুধু পোস্টার, আলোচনা সভা কিংবা বিশেষ দিবস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা।
প্রথমত, আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। বন, পাহাড়, নদী, হাওর, বিল, জলাভূমি ও উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থাকে আলাদা আলাদা নয়, একটি সমন্বিত জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। কাগজে-কলমে অভয়ারণ্য বা জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। সেখানে অবৈধ দখল, গাছ কাটা, শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রাণীর চলাচলের করিডর রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে হাতি ও বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য বনাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ থাকা জরুরি। বিচ্ছিন্ন বনভূমি অনেক সময় প্রাণীদের জন্য কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।
চতুর্থত, নগর পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্যকে বাধ্যতামূলক বিষয় করতে হবে। নতুন সড়ক, আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল বা বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে শুধু মানুষের জন্য সুবিধা কতটা হবে তা নয়—প্রকল্পটি স্থানীয় প্রাণী, জলাভূমি ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
পঞ্চমত, জলাভূমি রক্ষা করতে হবে। একটি পুকুর, খাল, বিল বা হাওর শুধু পানি নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। জলাভূমি রক্ষা মানে মাছ, পাখি, ব্যাঙ, কচ্ছপ ও অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাস রক্ষা।
ষষ্ঠত, শিকার ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশীদার করতে হবে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় না নিলে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য কঠিন।
সপ্তমত, গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ বাড়াতে হবে। কোন প্রাণী কোথায় আছে, তাদের সংখ্যা কত, সংখ্যা বাড়ছে না কমছে—কারনগুলো কি? এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ২০১৫ সালের রেড লিস্টে ২৭৮টি প্রাণীর ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি ছিল—এই জায়গায় গবেষণা বিশেষ জরুরি।
অষ্টমত, শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক শিক্ষা বাড়াতে হবে। যে শিশু একটি পাখির নাম জানে, একটি প্রজাপতিকে চেনে, একটি গাছকে ভালোবাসে—তার কাছে প্রকৃতি ধ্বংস করা সহজ হবে না। উদাহরণ হিসেবে বলছি- যার প্রতি ভালোবাসা থাকে তাকে কখনোই ধংস করতে পারে না। ঠিক প্রাণীর বেলায়ও তাই।
আমাদের মনে রাখতে হবে- প্রাণী রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার অংশ। বাঘ হারালে শুধু একটি প্রাণী হারায় না—একটি খাদ্যশৃঙ্খল দুর্বল হয়। মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে গেলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছ কমে গেলে জলজ প্রতিবেশব্যবস্থা বদলে যায়। জলাভূমি হারালে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। বন হারালে মাটি, পানি ও জলবায়ুর ওপর চাপ বাড়ে। প্রাণীকে বাঁচানো মানে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই বাঁচানো। তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত শুধু ‘প্রাণীকে ভালোবাসব’ নয়; বরং প্রাণীর ঘরটাকেও বাঁচাব।
- যে বন আমরা আজ কেটে ফেলছি, যে জলাভূমি আজ ভরাট করছি, যে নদী আজ দূষিত করছি—সেখানে হয়তো কোনো প্রাণী তার শেষ আশ্রয়টি হারাচ্ছে। একটি প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার আগে সে আমাদের কাছে কোনো আবেদনপত্র পাঠায় না।
শুধু একদিন সে আর দেখা যায় না। আর তখন তাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ অনেক সময় আর থাকে না।
বিশ্ব প্রাণী দিবস তাই উৎসবের দিন নয় শুধু—এটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করার দিন: বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম কি বইয়ের পাতায় প্রাণীদের দেখবে, নাকি প্রকৃতিতেও তাদের দেখতে পাবে?
লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক কলামলেখক ও গবেষক, [email protected]