সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমারের ঘুষ বাণিজ্যের নতুন কৌশল
ঘুষের টাকা গোনার ভিডিও ভাইরাল এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও বন্ধ হয়নি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সাব-রেজিস্ট্রারের ঘুষ বাণিজ্য।
সমালোচিত হওয়ার পর ধরন পাল্টে নতুনভাবে গ্রাহক হয়রানি, ঘুষ নেয়াসহ বিভিন্ন দুর্নীতি করছেন সাব রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস। এখন আর অফিসের ভেতরে না, বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে বাইরে থেকে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক জানান, সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার বহাল তবিয়তে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখন আর নিজ হাতে ঘুষের টাকা নেন না। বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে অফিসের বাইরের কোনো গোপন স্থানে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হচ্ছে। বিশ্বস্ত লোকদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই দলিল রেজিস্ট্রি করেন তিনি।
ঘুষের টাকা গুণে নেয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়া, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও সুব্রত কুমারের সাব-রেজিস্টার পদে বহাল থাকা নিয়ে ছড়িয়েছে গুঞ্জন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অদৃশ্য শক্তির কারণে সুব্রত কুমারসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিও হাতে পেয়ে জেলা রেজিস্ট্রার আবুল কালাম মো. মঞ্জুরুল ইসলাম নিজে শাহজাদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তদন্ত করতে এলেও তদন্ত ছিল অনেকটাই দায়সারা। এমনকি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও দেন শাহজাদপুরের সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস।
উপজেলার কাদাইবাদলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনিরুজ্জামান হেনা বলেন, ২৫ আগস্ট আমার স্ত্রীকে ১০ শতাংশ জমি দান করি। দলিল করতে দলিল লেখক আবু সাঈদ চৌধুরী রানার মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারকে ঘুষ ও অন্যান্য খরচ মিলে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, আমার ভাতিজা খালেদ মঞ্জুর রোমেল সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাসকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে এক কোটি টাকার জমি বিক্রি করেছে। প্রকৃতপক্ষে এত জমির মালিক সে নয়।
আরও এক ভূক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, আমার একটা আমমোক্তার নামা দলিল রেজিস্ট্রি করতে সাব-রেজিষ্ট্রারের কাছে যাই। তিনি কাগজপত্র দেখে আমাকে তিনদিন পর যেতে বলেন। কিন্তু আমি জরুরি প্রয়োজনের কথা বলতেই ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়ে সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার বলেন, টাকা দিলে দলিল একদিনেই রেজিস্ট্রি হবে। বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে দলিল করেছি।
দলিল লেখক মো. আবুল খায়ের বলেন, ঘুষ নেয়ার প্রতিবাদ করায় আমিসহ পাঁচজন দলিল লেখককে বরখাস্ত করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস। অজুহাত হিসেবে দলিল লেখায় ত্রুটির কথা বলেছেন।
শুধুমাত্র ঘুষ বাণিজ্যই নয়, সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাসের বিরুদ্ধে আয় বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও দলিল লেখকরা। তারা জানান, দলিল লেখকদের জন্য শেড নির্মাণের সময় সাব-রেজিস্ট্রার বেআইনিভাবে সরকারি দুটি বড় মেহগনি গাছ কেটেছেন। একটি বিক্রি করেছেন, অন্যটি দিয়ে নিজের বাড়ির ফার্নিচার বানিয়েছেন।
জেলা রেজিস্ট্রার আবুল কালাম মো. মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, শাহজাদপুরের সাব রেজিস্ট্রার ও তার কয়েকজন কর্মচারীর দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলো আমি দেখেছি। লিখিত অভিযোগ ও ভাইরাল হওয়া ভিডিও পেয়ে যে তদন্ত করছি, তা বিভাগীয় নয়। সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস সরকারি গাছ কাটা কিংবা সংবাদ সম্মেলনের জন্য কোনো অনুমতি নেননি। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি আগের কর্মস্থলেও শাস্তি পেয়েছেন।
শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বিমল কুমার কুণ্ডু বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার সংবাদ সম্মেলনকে বিতর্কিত করেছেন। তাই আমরা সংবাদ সম্মেলন বর্জন করেছি।
প্রেস ক্লাবের দফতর ও পাঠাগার সম্পাদক হাসানুজ্জামান তুহিন জানান, সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস নিয়মিত গ্রাহকদের বিপাকে ফেলছেন। গ্রাহকরা হয়রানি এড়াতে ঘুষ দিয়ে দলিল করতে বাধ্য হচ্ছে।
১৭ আগস্ট শাহজাদপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস ও তার কয়েকজন কর্মচারীর ঘুষ বাণিজ্য ও ঘুষের টাকা গোনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ২২ আগস্ট এ নিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপরই সুব্রত কুমার দাস সমালোচনার শীর্ষে উঠে আসেন। তবে ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হয়নি তার।
ডেইলি বাংলাদেশ/এআর