সর্বধর্ম সমন্বয়ের ‌‌‌‘মলয়া’

ঢাকা, শুক্রবার   ১০ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৭ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪১

Akash

সর্বধর্ম সমন্বয়ের ‌‌‌‘মলয়া’

 প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:৫৪ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পেশাগত পরিচয়ে আহসান ইমাম শিক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। করেন লেখালেখি এবং গবেষণা। বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম বিভাগে রয়েছে তার নিয়মিত অংশগ্রহণ

‘মলয়া’ মূলত আধ্যাত্মিক গান। এই গানের স্রষ্টা মনোমোহন দত্ত।‘নিষ্কাম ধর্ম’ প্রবর্তন ছিলো যার প্রধান উদ্দেশ্য। ‘মলয়া’ গানের বিভাজন করলে পাওয়া যায়- ‘সর্বধর্ম সঙ্গীত’, ‘স্বরূপ নির্ণয়’, ‘শ্যামা সঙ্গীত’, ‘কৃষ্ণ বিষয়ক সঙ্গীত’, ‘শিব সঙ্গীত’, গৌরাঙ্গ লীলা বিষয়ক সঙ্গীত’, এবং ‘ইসলাম বিষয়ক সঙ্গীত’। সঙ্গীতের এক একটি বিভাজন বা ধারার মধ্য দিয়ে এক একটি সুনির্দিষ্ট তত্ত্বকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, ‘মলয়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ স্বর্গীয় উদ্যান, নন্দন কানন, স্নিগ্ধ-শান্ত দখিনা বাতাস।

মনোমোহন দত্ত মাত্র ৩২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্ত্রী সৌদামিনী দত্ত এবং এক সন্তান সুধীর চন্দ্র রেখে গেছেন। তিনি ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত  সাতমোড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার মৃত্যুর পর ‘মলয়া’ সঙ্গীতের দুটি গ্রন্থ প্রকাশ পায়- (১) মলয়া (১ম খণ্ড) এবং (২) মলয়া (২য় খণ্ড)। এছাড়া তার ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ১০০০ কবিতা নিয়ে ‘তপোবন’, ‘উপবন’, ‘নির্মাল্য’, নামে তিনটি বই এবং ‘প্রেম ও প্রীতি’, ‘পথিক’, ‘সত্যশতক’, ‘ময়না’, ‘যোগ-প্রণালী’, ‘উপাসনাতত্ত্ব’, এবং ‘খনি’- আত্নতত্ত্ব বিষয়ক এবং ‘সর্বধর্মতত্ত্বসার’ নামে তত্ত্ববিষয়ক ২০০টি বিষয়ের সহজ ব্যাখ্যাসহ গ্রন্থ লিখেন। তিনি সর্বমোট ৮৫০ টি গান লিখেন।

সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামী থেকে সরে গিয়ে তিনি গানগুলো রচনা করেছিলেন। আবার সাকার, নিরাকার, দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ তত্ত্বে লিপ্ত না হয়ে সর্বজনীন সত্যতে অবস্থান করে একান্ত আবশ্যক যা- শুদ্ধ, নির্মল, অদ্বৈতপূর্ণ এবং জগতের যোগ রয়েছে- সেইসব সত্যকে অবলম্বন করে ‘মলয়া’ গান রচনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সর্বধর্ম সমন্বয় করে প্রত্যেক সাধক জীবনে স্বর্গীয় সুখ পেতে পারে।

সাম্প্রদায়িকতার যে সব হুংকার আমাদেরকে সত্য থেকে সরিয়ে নেয় তা থেকে সরে গিয়ে তিনি প্রকৃত সত্য উচ্চারণ করেছেন। যা উপরে উঠে তাই প্রতিভা। সেখানে বিষধর সাপের মাথার মণির মত তা জ্বলজ্বল করে। মনোমোহনের মাথা মণির মত জ্বলে উঠেছিলো। এরকম অবস্থাতেই  সঠিক তথা মনোমোহন সংকল্পের শীর্ষস্থানে থেকে সিদ্ধি লাভ করে মানুষের মনের সিংহাসনে বসেছেন। প্রকৃত সত্যের মহিমায় তিনি জয়ধ্বনিতে মেতেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উন্নতির অন্তরায়। তিনি তার ‘মলয়া’ গানের মধ্যে দেশপ্রেমের কথাও বলেছেন, যাব না সাজনি আর সে দেশে যে দেশের মানুষের সনে/ মন না মিশে স্বদেশে পড়িয়ে রব, বিদেশে আর নাহি যাব/ অনিমেষে চেয়ে রব, বাঁশি বাজায় কে এসে।
তিনি লিখেছেন-

        ‘জগতের সকল সম্প্রদায় আমার
        আমি জগতের সকল সম্প্রদায়ের’

বলেছেন-

      ‘পিতা মাতা সত্য গুরু, জ্ঞানদাতা ক্ল্পতরু
       ভাবগুরু ব্রক্ষময় পরম কারণ’

মৃত্যুর আগে তিনি বলেগেছেন, ‘সত্য জগতে এক। একদিন জগতে এমন সময় আসিবে, সকল জীব ভেদাভেদ ভুলিয়া যাইবে, এক সত্যের আশ্রয়ে জগত আশ্রয় নিবে, সাধনের চরম অবস্থা লাভ করিবে। দয়াময় আশ্রয় দান করিবেন, জগত মুক্ত হইবে।’

           ‘তুমিহে সর্বকুশল করহে আশ্রয় দান
            ধর্ম ধন্য দয়াময় নাম শ্রীআনন্দ-অবতারে
            সর্বধর্ম সমন্বয়ে জীবন মুক্তি এল দ্বারে।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর