খোলা আকাশের নিচে নারীদের ভাগ্য বদল

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

খোলা আকাশের নিচে নারীদের ভাগ্য বদল

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৯ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:০৯ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

নেই কোনো ঘর, নেই ছাদ, নেই বসার চেয়ার টেবিল, নেই কোনো পরিবেশন করার লোক। তবু খোলা আকাশের নিচে মাটিতে বসে খাবার খাচ্ছেন লোকজন।

এমন দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে। এখানে ভ্রাম্যমাণ হিসেবে খোলা আকাশের নিচে অসহায় কয়েকজন নারী গড়ে তুলেছেন নিরিবিলি হোটেল।

ওইসব হোটেলে পাওয়া যাচ্ছে ভাত, সবজি, ডিম, মাছ আর মাংস। এখানে ১৫ টাকা থেকে ৪০ টাকার মধ্যে খাবার খাওয়া যায়।

স্বাচ্ছন্দ্যে স্বল্প দামে মাটিতে বসে খোলা আকাশের নিচে ভাত খাচ্ছেন অসহায় হতদরিদ্র,ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের লোকজন। তবে হোটেলগুলো প্রচলিত অন্যসব হেটেলের চাইতে একেবাই রয়েছে আলাদা। এখানে নেই বসার চেয়ার, নেই কোনো টেবিল, নিজে পাকুশি ও নিজেই পরিবেশন করে খাবার বিক্রি করছেন । 

যে সমস্ত লোকজন এখানে ভাত খেতে আসেন তাদের পক্ষে প্রচলিত কোনো হোটেলে গিয়ে ভাত খাওয়া সম্ভব নয়। অসহায় হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের লোকদের কাছে খোলা আকাশের হোটেল যেন একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে খোলা আকাশের নিচে নিরিবিলি হোটেল ব্যবসায় অনেক নারী ভাগ্য বদল করেছে।

ইচ্ছা আর দৃঢ় মনোবলকে কাজে লাগিয়ে ভ্রাম্যমাণ হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে সুফিয়া বেগম, জাহানারা, আলেয়া বেগমসহ অনেক নারী তাদের অভাব অনটনকে জয় করেছেন। 

দেশের পূর্বাঞ্চল রেলপথের ঐতিহ্যবাহী রেলজংশন হলো আখাউড়া। এ জংশন স্টেশনের উপর দিয়ে আন্তনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেন দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ভ্রমণ করে থাকেন। কিন্তু ওই সব ট্রেন যাত্রীদের মধ্যে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র লোকজনও রয়েছে। 

তাছাড়া এ জংশন স্টেশনে অসংখ্য অসহায় হতদরিদ্র ছিন্নমূল, ভিক্ষুক ও ভাসমান লোক রয়েছে। ওই সমস্ত লোকদের থাকা খাওয়াসহ নানা রকমের সমস্যা রয়েছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ লোকজনই শহরের কোনো হোটেলে গিয়ে ভাত খাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের ভাত খাওয়ার জন্য যে টাকা দরকার তাদের কাছে সে টাকা নেই। তাই তারা বাধ্য হয়ে বড় বড় হোটেলের বিপরীতে খোলা আকাশের নিচে স্বল্প দামে ভাত খেয়ে দিন কাটায়। 

স্টেশন এলাকায় বাদাম বিক্রেতা বাবু মিয়া বলেন, সারাদিন ২৫০ থেকে ৩০ টাকার বাদাম বিক্রি করা খুবই কঠিন। তাই কোনো বড় হোটেলে একবেলা ভাত খেতে ৫০ টাকার উপর লেগে যায়। তাই এখানে ২০ টাকার মধ্যে ভাত খাওয়া যায়। 

ভিক্ষুক সিরাজ মিয়া মিয়া বলেন, সারা দিন ভিক্ষা করে রাতের বেলায় এ স্টেশনে থাকতে হয়। তাই এখানে কম টাকায় ভাত খাওয়া যায়। আমাদের মতো গরিব লোকদের জন্য এ হোটেল না থাকলে হয়তো না খেয়েই থাকতে হতো। 

আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের নিচে তাকালেই চোখে পড়ে অনেক নিরিবিলি হোটেল।

ভাত, মাংস, ডিম, সবজি তরকারি নিয়ে মাটিতে বসে বিক্রি করছেন বেশ কয়েকজন নারী। তাদের কাছে উপরে ৪০ টাকা নিচে ১৫ টাকায় ভাত পাওয়া যায়। 

সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত চলে তাদের বেচা কেনা। ওই সব নারীর মধ্যে রয়েছে সুফিয়া বেগম, জাহানারা, আলেয়া বেগমসহ অনেক নারী। 

আলেয়া বেগম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে ভাত বিক্রি করছি। প্রতিদিন ৪-৫ কেজি চালের ভাত বিক্রি করা যায়। সে সঙ্গে মাংস, ডিম, সবজি তরকারি রয়েছে। তিনি নিজেই বাসা থেকে রান্না করে নিজেই বসে লোকদেরকে পরিবেশন করে খাওয়ান। ছিন্নমূল, অসহায় নিম্ম আয়ের লোকজন মাটিতে বসে খেতে কোনো সংকোচ করে না। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  ১ হাজার টাকার উপর বিক্রি হয়। খরচ বাদে দৈনিক ৩০০ টাকার উপর আয় হয়। 

সুফিয়া বেগম বলেন, খোলা আকাশের নিচে প্রতিদিন ভাত বিক্রি করছেন। সকাল থেকে বিকেল পযর্ন্ত ভালোই ভাত বিক্রি হয়। এই আয়ের মাধ্যমেই চলছে তার সংসার। 

জাহানারা বলেন, অসহায় গরিব ও নিম্ম আয়ের ভাসমান লোকজন স্বল্প দামে এখানে ভাত খাচ্ছেন। আকাশ ভালো থাকলে ভাত বিক্রি ভালো হয়। তাছাড়া রেলওয়ের বড় কর্মকর্তা আসলে এখানে ভাত বিক্রি করা যায় না। সে দিন অবসরে থাকতে হয়।

তিনি বলেন, এক সময় সংসারে অভাব অনটন থাকায় প্রায় অনাহারে অর্ধাহারে কেটেছে তাদের প্রথম জীবন। এরপর নিজ উদ্যোগে স্টেশন এলাকায় খোলা আকাশের নিচে ভাতের হোটেল ব্যবসা  দিয়ে পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। ইচ্ছা করলে মানুষ অনেক কিছু করতে পারে আমরা এ চেষ্টা করছি। বর্তমানে এ ব্যবসা ভালোই চলছে। এ ব্যবসা করে আমি খুবই খুশি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ