ঢাকা,  সোমবার   ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

[ খবর ]

১২০০ বছর পূর্বেও ছিল টেলিফোনের ব্যবহার!

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:৫০, ১৮ এপ্রিল ২০২০
১২০০ বছর পূর্বেও ছিল টেলিফোনের ব্যবহার!
ছবি: কাদামাটির এই শহরেই টেলিফোনের ব্যবহার শুরু হয়

স্মার্টফোনে সময় দেখে সবারই প্রতিটি দিন শুরু হয়! তারপর সারাদিন যোগাযোগ ছাড়াও নানা কাজে ব্যবহার করা হয় স্মার্টফোন। আমাদের এক মুহূর্তও যেন ফোন ছাড়া চলেই না।

সস্তা, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং এর মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়। শুধু স্মার্টফোন নয় টেলিফোনও কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম এক হাতিয়ার। টেলিফোনের যাত্রা বহু বছর আগেই শুরু হয়।

সারা বিশ্বে বর্তমানে শত কোটি টেলিফোন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। টেলিফোনের মাধ্যমে হাজারো মাইল দূরের দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়। যোগাযোগ সহজ করার জন্য ১৮৭৬ সালে মার্কিন উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে মুখের কথা পাঠানোর যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত স্মার্টফোনের যাত্রা ২০০৭ সালে। 

চিমুর রাজধানী চান চ্যানজানেন কি? ১৪৪ বছর আগে টেলিফোন উদ্ভাবিত হলেও এর ব্যবহার ১২০০ বছর আগেও ছিল। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হত এটি। অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়! হ্যাঁ, প্রাচীন আবিষ্কারেরগুলোর মধ্যে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার হাজার বছরের পুরনো এই টেলিফোন। এটি পেরুর চান চ্যানের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া যায়। 

ধরণা করা হয় এটি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার চারশ বছর আগের তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যা ব্যবহার করা হত যোগাযোগের জন্য। এটি পশ্চিম গোলার্ধের টেলিফোন প্রযুক্তির প্রথমতম উদাহরণ। ধারণা করা হয়, উত্তর পেরুর রাও মোচে উপত্যকার উপকূলীয় চিমো সভ্যতার মানুষের উদ্ভাবন এটি।    

আমেরিকান ইন্ডিয়ান (এনএমএআই) এর জাতীয় যাদুঘরের কিউরেটর রামিরো মাতোস বলেছেন, এটি অনন্য একটি আবিষ্কার। তবে এটি এমন একটি আদিবাসী সমাজ থেকে এসেছে যার কোনো লিখিত ভাষা নেই। ১৯ শতকে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথম শতাব্দীতে এটি সাধারণ দড়ির সঙ্গে সংযুক্ত টিনের ক্যান দিয়ে বানানো হয়েছিল। এর দুই প্রান্ত দু’জনের কাছে থাকতো। এভাবেই তারা একে অপরের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ সারতো বলে ধারণা করা হয়।

চিমু সভ্যতার নিদর্শনপ্রাচীন চিমো সভ্যতার একটি মূল্যবান যন্ত্র হিসেবে ধরা হয় টেলিফোনকে। ডিভাইসটি অবশ্য তখন কর্ডের সঙ্গে দুটি কর্ক বেঁধে তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি তিন দশমিক পাঁচ ইঞ্চি (আট দশমিক নয় সেন্টিমিটার) টিনের ক্যান ছিল। যা ট্রান্সমিটার ও শব্দ শোনার কাজে ব্যবহৃত হত। অনেকটা লাউয়ের মতো দেখতে ছিল টিনের ক্যানগুলো। এই দুটি কর্ক সংযুক্ত থাকতো ৭৫ ফুট (২২ দশমিক আট মিটার) সুতির সুতার তৈরি দড়িতে। 

চিমোদের উদ্ভাবিত এমন ধাঁচের টেলিফোন ১৮৩৩ সাল থেকে পরবর্তী এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গবেষণার পূর্বাভাস দিয়েছে। যা দড়ি বা তার দিয়ে শুরু হয়েছিল। গবেষকরা বের করতে চেষ্টা করেন, চিমো জাতি এই প্রাচীন ফোনটি কীভাবে ব্যবহার করেছিল? আর কেনই বা তাদের এটি প্রয়োজন হয়েছিল? 

মাতোস লিখেছেন, চিমো সভ্যতার লোকেরা শীর্ষস্থানীয় একটি সমাজে বসবাস করতেন। তাই ধারণা করা হয়, সে সময়কার বেশিরভাগ অভিজাত এবং পুরোহিতরাই এই ধরনের মূল্যবান উপকরণের অধিকারী হতে পারে। এই মূল্যবান টেলিফোনের সাহায্যে দুই প্রান্তের ব্যক্তিরা একে অন্যের কথা শুনতে পারত।

প্রাচীন টেলিফোনঅন্যান্য অনেক প্রাচীন নিদর্শনের মতোই বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেয় এই টেলিফোন। অনেকে হয়তো এটিকে নিছক শিশুদের খেলনা হিসেবে বিবেচনা করবে। আধুনিক সমাজে এগুলোর তেমন মর্যাদা না থাকলেও অতীতের মানুষের কাছের মূল্য ছিল অনেক।

ধর্মীয় জিনিস বা পুরোহিতের সরঞ্জাম হিসেবে এটি বেশ মর্যাদার ছিল। এই অসাধারণ প্রাচীন টেলিফোনটি আবিষ্কার করেন ব্যারন ওয়ালরাম ভি। তিনি ১৯৩০ এর দশকে পেরুর অনেক খননকাজে অংশ নিয়েছিলেন। সেসময় চান চ্যানের ধ্বংসাবশেষ খনন করার সময় নিদর্শনটি খুঁজে পান তিনি। 

ব্যারন ওয়ালরাম ভি বিভিন্ন জাদুঘরে তার সংগৃহীত প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে দান করেন। চিমুর এই প্রাচীন টেলিফোনটি তিনি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের আমেরিকান ভারতীয় স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরে দান করেন। সেখানে এটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। 

ধাতব শিল্প তৈরিতে পারদর্শী ছিল চিমুরাসেন্ট্রাল অ্যান্ডিসের গবেষণায় নৃবিজ্ঞানী এবং প্রত্নতত্ববিদ মাতোস ব্যাখ্যা করেছিলেন, এই টেলিফোনের উদ্ভাবক ছিলেন চিমু। তিনি পেশায় একজন পুরহিত হলেও ছিলেন একজন দক্ষ উদ্ভাবক। যিনি একটি চিত্তাকর্ষক প্রকৌশল সমাজের অধিকারী ছিলেন। 

এছাড়াও চিমু জাতি ছিল বেশ উঁচু স্তরের। তাদের চিন্তা ভাবনাও ছিল অনেক উন্নত। হাইড্রোলিক খাল-সেচ ব্যবস্থা, বিস্তৃত ধাতব শিল্পসহ বিভিন্ন নিদর্শনগুলো থেকে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। চিমু ছিল চিমোর রাজ্যের লোক। চিমোর রাজধানী শহর ছিল চান চ্যান।

একটি বিস্তৃত কাদামাটি ইটের তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম এক শহর। এছাড়াও প্রাক-কলোম্বিয়ার বৃহত্তম শহর হিসেবেও পরিচিত এই চান চ্যান শহর। দক্ষিণ আমেরিকার চান চ্যান শহরের আয়তন ছিল মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটার বা সাত দশমিক সাত বর্গমাইল। 

১২০০ বছর পূর্বে এটিই ছিল চিমুর রাজধানী১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর বাসিন্দা ছিল মাত্র এক লাখ। পুরো শহরটি কাদা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি দেয়ালে নানা ভাস্কর্য, ছবি খোদাই করে এঁকে সাজানো ছিল। চিমোর রাজধানী শহর চান চ্যান ছিল সে সময়কার এক আশ্চর্যজনক নির্মাণ। চিমো সংস্কৃতি প্রায় ৯০০ খ্রিস্টাব্দে উত্থিত হয়েছিল। তবে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে এটি ইনকা কর্তৃক স্বাধীনতা লাভ করে। 

চিমু জাতি টেলিফোন এবং আরো অনেক আশ্চর্যজনক প্রাচীন প্রযুক্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রাচীন সংস্কৃতিগুলো কতটা সমৃদ্ধ ছিল। আধুনিক সমাজ স্বপ্ন দেখার অনেক আগেই তারা দুর্দান্ত সব উদ্ভাবন, ধারণা এবং সৃষ্টিকর্ম দেখিয়ে দিয়েছে।

সূত্র: অ্যানসাইন্টঅরিজিন

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!