লন্ডন টাওয়ারের এই গুপ্ত ঘরে যে ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড ঘটত
এক রাতে লন্ডন টাওয়ার থেকে দুই কয়েদী পালাচ্ছিলেন। ১৫৩৪ সালের কোনো এক রাতের ঘটনা এটি। যদিও দুই কয়েদীই আলাদাভাবে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কেউই কারো কথা জানতেন না। একজন ছিলেন এলিস টানকারভিলি নামের নারী অন্যজন জন বাউড পুরুষ কয়েদী।
তারা দুইজনই চুরির অপরাধে বন্দী হয়েছিলেন। টাওয়ারের প্রবেশদ্বারে এসে দুইজনের দেখা হয়ে যায়। একজন অন্যজনকে দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। প্রেমে পড়ে যান একে অপরের। এটিই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রক্ষীদের কাছে ধরা পড়ে যায় দুইজনই। তাদের সাধারণ শাস্তি থেকে লিটল ইজে দেয়া হয়।
লন্ডনের ঐতিহাসিক দুর্গ টাওয়ার অব লন্ডন একসময় রাজকীয় বাসভবন ছিল। তবে শুধু তাই ই নয়, এটি পৃথিবীব্যাপী পরিচিত আরো অনেক বৈশিষ্ট্যের জন্য। কখনো অস্ত্রাগার, কখনো কোষাগার, কখনো বা নথিপত্রের ভাণ্ডার। আবার কখনো ব্যবহৃত হয়েছে ইংল্যান্ডের রাজকীয় গয়না ও সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে। প্রায় সব ভূমিকাতে কাজে লাগানো হয়েছে এই ঐতিহাসিক ভবনটিকে। তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত এর ভয়ংকর কয়েদখানা এবং নির্যাতন কক্ষের জন্য।
টাওয়ারটি তৈরির পর থেকেই এর কারাগার দেখা পেয়েছিল বেশ কিছু ইতিহাস প্রসিদ্ধ কয়েদীর। তার মধ্যে উঠতি বিপ্লবী থেকে শুরু করে লাঞ্ছিত রাজবংশীয়। অষ্টম হেনরির স্ত্রী অ্যান বোলেন এখানেই বন্দী ছিলেন। লন্ডন টাওয়ারের সব থেকে উল্লেখযোগ্য নির্যাতন কক্ষ ছিল লিটল ইজ। ওয়ার অব লন্ডনের কুখ্যাত কারাকক্ষ নামে পরিচিত লিটল ইজ। এ কক্ষটি এমন করে বানানো, যেন এতে থাকা কয়েদী সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা শুতে না পারে।
জানালাবিহীন মাত্র চার বর্গফুট বা এক দশমিক দুই মি.মি আয়তনের ছিল কক্ষটি। অন্ধকার কক্ষটিতে বন্দীর নড়াচড়া তো দূরে থাক নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হত। অনেক বন্দী শ্বাসরোধ হয়ে এখানেই মারা গেছেন। ১২১৫ সালে ইংল্যান্ড ম্যাগনা কার্টাসে এই কক্ষে কয়েদীকে প্রেরণ করতে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বলা হয়, রাজকীয় পরোয়ানা ছাড়া এখানে কয়েদী প্রেরণ করা অবৈধ। তবে রাজা দ্বিতীয় অ্যাডওয়ার্ড সে সময়ের পোপের চাপের মুখে পরে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হন।
রাজা চতুর্থ ফিলিপের সময় ধর্মবিরোধী, অশ্লীল রীতি, মূর্তিপূজা এবং অন্যান্য বিভিন্ন অপরাধের জন্য লিটল ইজে প্রেরণ করা হত। তবে এখান থেকে অনেক অপরাধী মুক্ত হতে পেরেছিল। আবার অনেককে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দ্বিতীয়বার এডওয়ার্ড লিটল ইজে কারাবাসের আদেশ দেয়ার পরে, ফরাসি সন্ন্যাসীরা তাদের ভয়ঙ্কর যন্ত্রগুলো নিয়ে লন্ডনে পৌঁছেছিলেন।
দ্য হিস্ট্রির এক প্রতিবেদন অনুসারে, নাইটস টেম্পলার ছিল লন্ডনের টাওয়ারের মন্দির এবং গির্জা। এর অনেকগুলো প্রবেশ পথ ছিল। যা মানুষকে গোলক ধাঁধায় ফেলে দিত। টাওয়ারের মধ্যে গোপন অস্ত্রাগার, রাজকীয় আবাস এবং সামরিক দুর্গ ছিল। যা সাধারণ মানুষের জন্য বাইরে থেকে বোঝা সহজ ছিল না।
আর যে কেউ এর মধ্যে যেতেও পারত না। ষোড়শ শতাব্দীতে লন্ডনের টাওয়ারে বন্দীদের উপর নির্যাতন অনেক বেড়ে যায়। টাওয়ারের থেমসের দুর্গটিকে খুব কমই রাজপরিবারের লোকেরা বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে। পাথরের তৈরি এই দুর্গটি বন্দীদের জন্যই ব্যবহার করা হত।
ইংল্যান্ডের দ্য হিস্ট্রি অব টর্চার বইয়ে ১৯৩৩ সালে ঐতিহাসিক এল এ পেরি লিখেছিলেন, এটি টিউডারদের সময়ে বন্দীদের উপর নির্যাতন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অষ্টম হেনরির অধীনে থাকাকালীন এটি সব থেকে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে অ্যাডওয়ার্ড ষষ্ঠ এবং মেরির রাজত্বকালে খুব কম নির্যাতনেরই শিকার হয়েছেন বন্দীরা।
ইয়েমেন ওয়ার্ডার জন বাউড স্বীকার করেছেন, ভালোবাসার জন্য তিনি পালাতে পারেননি। এক মুহূর্তের ভালোবাসাই তার পথ রোধ করেছিল। তবে এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। টাওয়ারের লেফটেন্যান্ট অ্যালিস টানকারভিলি প্রেমিক যুগলকে ধরেছিলেন। লিটল ইজ কক্ষে তাদের বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়।
২৮ মার্চ লেফটেন্যান্ট অ্যালিস টানকারভিলির কাছে লর্ড লিসেলের চিঠি আসে। এরপর তাদের টেমস নদীর উপরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। লিটল ইজের নির্যাতনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সেসময় সবাই অবগত ছিল। তবে লিটল ইজ টাওয়ারের ঠিক কোথায় ছিল তা আজো কেউ জানে না। এটিকে বলা হয় হোয়াইট টাওয়ারের অন্ধকূপ।
অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন এটি টাওয়ারের পুরানো ফ্লিন্ট বেসমেন্টে থাকতে পারে। তবে তা শুধুই অনুমান। লন্ডন টাওয়ার এখন পর্যটকদের জন্য এক দর্শনীয় স্থান। তবে এর প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে নানা দুঃখ, সুখ, অভিমান, কষ্টের গল্প। লিটল ইজ ছাড়াও সেসময় বন্দীদের শাস্তির জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত হত ম্যানকুলস এবং স্কেভেনজার ডটার নামে একটি ভয়াবহ উপায়।
অনেক বন্দীদের জন্য ছিল নির্জন কারাবাস, বারবার জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক শাস্তির ব্যবস্থা। অনেক সময় এমন হত শাস্তির মাত্রা এতই ছিল যে, তা থেকে বাঁচতে নিরপরাধরাও অপরাধ স্বীকার করে নিত। লিটল ইজের বর্বরতা আর নিষ্ঠুর শাস্তির কথা ছড়িয়ে পরে চারদিকে। এরপর প্রথম চার্লসের রাজত্বকালে, এই চর্চা চিরতরে বাতিল হয়ে যায়।
অন্ধকার বায়ুবিহীন কক্ষে কারাগারের বন্দীদের শাস্তির জন্য রাখা হত না। এর বদলে অন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। হারিয়ে যায় এর অবস্থান। তবে আজো এর ভয়াবহ শাস্তির কথা শুনলে শিউরে ওঠেন অনেকেই। এত ছোট্ট কক্ষে থাকা বন্দীদের কথা মনে করে কিছুটা ব্যথিতও হন।
সূত্র: দ্যভিন্টেজনিউজ