ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ভ্রমণ ]
মস্কো থেকে বিশ্বপথে : পর্ব দুই

দিল্লি থেকে ভোরোনেজ : বরফ, বনভূমি আর স্বাধীনতার সন্ধানে 

মোহাম্মদ কামরুল হাসান
প্রকাশিত: ১৬:৫৯, ১৭ জুন ২০২৬
দিল্লি থেকে ভোরোনেজ : বরফ, বনভূমি আর স্বাধীনতার সন্ধানে 
ছবি : লেখক কর্তৃক সংগৃহিত

রাশিয়া যাওয়ার আগে কিছুদিন আমি ভারতে ছিলাম—দিল্লির পাশের শহর হরিয়ানার গুরগাঁওয়ে একটি টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ক্লাস শুরু হতে দেরি হওয়ায় দিল্লির এক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটারের হাতে খড়ি নিচ্ছিলাম  ।

সে সময় ভারতে অনেক জায়গায় ঘুরেছি, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি জানার চেষ্টা করেছি। তখনকার ভারত ছিল ভিন্ন—মানুষ ছিল উদার, সহনশীল, শিক্ষিত, ধর্মনিরপেক্ষ। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে সেই সময়টা যেন আরও মানবিক মনে হয়।

Advertisement

তবে ভারতে আমার অবস্থান দীর্ঘ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই রাশিয়া পাড়ি জমালাম। ভোরোনেজ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার আগে পড়তাম ভোরোনেজ স্টেট অ্যাকাডেমি অব ফরেস্ট্রি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রিপারেটরি ফ্যাকাল্টিতে। রাশিয়ায় মূল কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে এক বছরের প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা করতে হয়—যাতে ভাষা শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভিত্তি তৈরি হয়।

বিশাল বনভূমির মাঝে, প্রাকৃতিক নৈঃশব্দে ঘেরা সেই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যেন এক প্রশান্ত আশ্রয়। পৌঁছানোর সময় চারপাশে ধবধবে বরফ, দূরে শুধু উঁচু পাইনগাছগুলো দাঁড়িয়ে—মনে হতো, পৃথিবীটা যেন সাদা রঙে মোড়ানো। প্রতিদিন সকালে রাস্তা পরিষ্কার করা হতো যাতে সবাই চলাচল করতে পারে।

এই ভোরোনেজ শহরটি মূলত ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনস্থল। দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার ভোরোনেজ নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি একই সাথে প্রাচীন গৌরব ও আধুনিক শিল্পের এক অনন্য কেন্দ্র। 

১৭ শতকের শেষভাগে জার পিটার দ্য গ্রেট এখানে রাশিয়ার প্রথম আধুনিক নৌবহর নির্মাণ করেছিলেন, যার গৌরবময় ইতিহাস ধারণ করে শহরটিকে আজও "রাশিয়ান নৌবাহিনীর দোলনা" বলা হয়।  এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য এটি "সিটি অফ মিলিটারি গ্লোরি" উপাধিতে ভূষিত হয়।

পড়াশোনার সূত্রে আমি জেনেছিলাম, বর্তমানে এটি রাশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও শিক্ষা নগরী।  বিখ্যাত বিমান নির্মাণ শিল্প ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি এখানে ভোরোনেজ স্টেট ইউনিভার্সিটির মতো নামী প্রতিষ্ঠানে আমাদের মতো হাজার হাজার দেশী-বিদেশী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।  

এই মূল ধারার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও এখানে রয়েছে ভোরোনেজ স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, ভোরোনেজ স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, ভোরোনেজ স্টেট এগ্রিকালচারাল (কৃষি) ইউনিভার্সিটি এবং ভোরোনেজ স্টেট পেডাগজিক্যাল (শিক্ষক প্রশিক্ষণ) ইউনিভার্সিটি-র মতো বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। 

বিশাল অ্যানাউন্সিয়েশন ক্যাথেড্রাল, মনোরম কৃত্রিম হ্রদ এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই শহরটি একদিকে যেমন রাশিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে।  সব মিলিয়ে এই শহরে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই ৬টি। আর বিভিন্ন ইন্সটিটিউট, অ্যাকাডেমি এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা মেলালে এই সংখ্যাটি ২৫টির কাছাকাছি পৌঁছায়।

রাশিয়ায় তখনও কমিউনিজমের ছায়া স্পষ্ট। শহর, বন্দর, গ্রাম—সব জায়গাতেই পরিপাটি পরিকল্পনা।  প্রতিটি আবাসিক ভবনে শিশুদের খেলার জায়গা, বৃদ্ধদের হাঁটার পথ, গ্রাম পর্যন্ত ভালো স্কুল, ব্যায়ামাগার, সুইমিং পুল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—সবই ছিল।  গৃহহীন মানুষ প্রায় ছিল না।  তবু প্রশ্ন জাগত—এত কিছু থাকার পরেও কমিউনিজমের পতন ঘটল কেন?
যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অনেকেই বলতেন—“রাষ্ট্র আমাদের সব দিয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতা দেয়নি।”

তারা চাইত নিজেদের মতো করে বাঁচতে, মত প্রকাশ করতে।  কিন্তু রাষ্ট্র যেন ছিল এক সুসজ্জিত কারাগার—যেখানে সুখ আছে, নিরাপত্তা আছে, কিন্তু মুক্তি নেই।এই উপলব্ধিই হয়তো ব্যাখ্যা করে দেয়—কেন একদিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মতবাদটিও ভেঙে পড়েছিল মানুষের অন্তরের স্বাধীনতার কাছে।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!